ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব, নতুন পোশাক, ভালো খাবার আর প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো বিশেষ মুহূর্ত। কিন্তু সমাজের এক শ্রেণির মানুষের জন্য ঈদ আসে অন্যরকম এক বাস্তবতা নিয়ে। দায়িত্ব পালনের কারণে তারা যেমন উৎসব থেকে দূরে থাকেন, তেমনি জোটে না কোনও বাড়তি সুবিধা, এমনকি ঈদের বিশেষ খাবারও পান না তারা। ফলে ঈদের কোনও বিশেষত্ব থাকে না তাদের কাছে।
তেমনই এক অবহেলিত পেশার মানুষ হলেন এটিএম বুথের নিরাপত্তারক্ষীরা। নগরজীবনে ব্যাংকিং সেবার এক অপরিহার্য অংশ হলেও, তাদের ঈদ কেমন কাটে— সেটা দেখার কেউ নেই। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, সিকিউরিটি গার্ড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, এমনকি সমাজের সামর্থ্যবান মানুষরাও তাদের দিকে নজর রাখেন না।
রাতদিন দায়িত্ব, কিন্তু বিনিময়ে কিছুই নয়
গত মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) ঈদের দ্বিতীয় দিন দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁও, কাওরান বাজার, গ্রিন রোড, পান্থপথসহ বিভিন্ন স্থানে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের দিন তাদের বেশিরভাগই বিশেষ কোনও খাবার পাননি। খেজুর, মুড়ি কিংবা শুধু পানি খেয়েই কেটেছে তাদের ঈদ।
ফার্মগেটের পূবালী ব্যাংকের এটিএম বুথে দায়িত্বে থাকা ৬৫ বছর বয়সী তারা মিয়া। তিন সন্তান থাকলেও কেউ তার খোঁজ রাখে না। স্ত্রীও গত বছর মারা গেছেন। তিনি বলেন, ‘সকালে মসজিদে নামাজ পড়ে দুইটা খেজুর আর এক গ্লাস পানি খাইছিলাম। সারাদিন কিছু খাইনি। ভেবেছিলাম, কোম্পানি থেকে একটু পোলাও-মাংস দেবে, কিন্তু তাও জোটেনি। রাতে হোটেল থেকে ২০ টাকার ভাত আর ১০ টাকার ডাল এনে খেয়েছি।’
গ্রিন রোডের যমুনা ব্যাংকের এক এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করেন নিরাপত্তাকর্মী আবদুল্লাহ। পাবনার সাঁথিয়ায় তার বাড়ি, বাবা-মা ও তিন ভাই-বোন গ্রামে থাকেন। মাত্র এক মাস হলো এই চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, এখনও পুরো বেতন পাননি। ঈদের দিন খেজুর খেয়েই দুপুর পর্যন্ত পার করতে হয়েছে। নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য ছিল না, কারণ তার পাওয়া সামান্য টাকাও বাবার চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আবদুল্লাহ বলেন, ‘বাবা অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি। বাবার চিকিৎসার জন্য অর্থ দরকার। ভাবছিলাম ঈদে ছুটি দিলে বাড়ি গিয়ে বাবাকে দেখে আসতাম। সেটা আর হলো না। ঈদের কোনও বোনাস দেয়নি। আধা মাসের বেতন পাইছি, সেটা বাবার অসুস্থতার জন্য বাড়িতে পাঠাইছি। ঈদে কাউকে কিছু কিনে দিতে পারিনি। নিজেও কিছু কিনতে পারিনি।’
বাড়ি ফেরা হয় না, ভালো খাবারও জোটে না
সাতক্ষীরার নাজমুল হাসান ঢাকায় ফার্মগেটের সাউথইস্ট ব্যাংকের এক এটিএম বুথে নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। মাসে সাড়ে ৯ হাজার টাকা বেতন পেলেও ঈদে পাননি বোনাস, নতুন পোশাক পাননি তিনি।
নাজমুল বলেন, ‘বাবা-মা ফোন করে অনেক আফসোস করেছে। বলেছে— ঈদে সবাই বাড়ি আসে, আর তুই আসিস না। চাকরি করে তো আর তা সম্ভব না। কিন্তু আমাদের সেই হিসাবে মূল্যায়ন করা হয় না, সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হয় না।’
একই কষ্টের কথা বললেন এবি ব্যাংকের পান্থপথের এটিএম বুথের নিরাপত্তারক্ষী আব্দুল হালিম। তিনি বলেন, ‘কোম্পানি বলেছে ঈদের পর বোনাস দেবে, ঈদের পর বোনাস দিয়ে করবো কী? পরিবার আছে, তাদের জন্যও কিছু করতে পারি না। আমাদের কষ্ট কেউ বোঝে না।’
দায়িত্ব অনেক, কিন্তু তদারকি নেই
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩ হাজার ৪২৮টি এটিএম বুথ রয়েছে। ঈদের সময় নগদ উত্তোলনের চাপ বেড়ে যায়, ফলে নিরাপত্তারক্ষীদের দায়িত্বও অনেক বেশি।
কিন্তু তাদের প্রতি ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কোনও মানবিক দৃষ্টি নেই। দেওয়া হয় না সম্মানজনক কোনও বোনাস। ঈদ উপলক্ষে দেওয়া হয় না নতুন পোশাক। নেই ঈদের বিশেষ খাবার। সারাদিন দায়িত্ব পালনের পরও কোনও স্বীকৃতি পায় না তারা। তাদের কেউ কেউ কষ্ট করে নিজেদের টাকায় কিছু খাবার কিনেছেন, কেউ কেউ সারাদিন না খেয়ে কাটিয়েছেন।
ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব কী?
এটিএম বুথের নিরাপত্তারক্ষীরা কোনও ব্যাংকের স্থায়ী কর্মী নন। তাদের সরবরাহ করা হয় থার্ড পার্টি সিকিউরিটি কোম্পানির মাধ্যমে। ফলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের কোনও সুযোগ-সুবিধা দেয় না, আবার সিকিউরিটি কোম্পানিগুলোরও নেই কোনও মানবিক উদ্যোগ।
প্রশ্ন হলো, যাদের পাহারায় কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়, যাদের সতর্কতায় ব্যাংকের গ্রাহকেরা নিশ্চিন্তে টাকা তুলতে পারেন— তাদের বেঁচে থাকার জন্য কী অন্তত ঈদের দিনে একটি ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত নয়?
একজন নিরাপত্তারক্ষী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঈদের দিনে যারা আমাদের এটিএম থেকে টাকা তোলেন, তারা একবারও আমাদের দিকে তাকায় না। আমাদেরও পরিবার আছে, আমাদেরও আনন্দ করার অধিকার আছে।’
জবাবদিহি কবে আসবে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি ব্যাংক, সিকিউরিটি কোম্পানি এবং সমাজের দায়িত্বশীলদের আরও মানবিক হওয়া দরকার। ঈদের সময় অন্তত তাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত। সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো যেন নির্ধারিত সময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ করে, তা নিশ্চিত করা দরকার। নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও ন্যায্য বেতন কাঠামো থাকা দরকার। ব্যাংকগুলোকে উচিত নিরাপত্তারক্ষীদের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করা।
শুধু এটিএম বুথ নয়, সবখানে নিরাপত্তাকর্মীরা অবহেলিত
শুধু এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মীরাই নন, বাসা-বাড়ি, অফিস, শপিং মল, হাসপাতাল কিংবা পাড়া-মহল্লার গেটেও যারা দিনের পর দিন দায়িত্ব পালন করেন, তারাও একই অবহেলার শিকার। উৎসবের দিনগুলোতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তো দূরের কথা, অনেক সময় ন্যূনতম ভালো খাবারও জোটে না তাদের কপালে। সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলস পরিশ্রম করলেও, তাদের প্রতি নেই তেমন কোনও মানবিক দৃষ্টি। ঈদ আসে, ঈদ চলে যায়— কিন্তু তাদের কষ্ট আর বঞ্চনা থেকে যায় একই রকম।