রাজধানীর বনশ্রীতে এক নারী সংবাদকর্মীকে হেনস্তা ও মারধরের ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হলেও উল্টো ভুক্তভোগী রাফিয়া তামান্নাকেই দোষারোপের চেষ্টা করছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি নারী অধিকার সংগঠনগুলোর নজরে আসার পর তারা একে ভিকটিম ব্লেমিংয়ের (ভুক্তভোগীকেই দোষারোপের প্রবণতা) ‘জঘন্য উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
গত এক মাস আগে রাজধানীর লালমাটিয়ায় ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার সঙ্গেও এর মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। ওই ঘটনায় ধূমপানকে কেন্দ্র করে এক নারী হেনস্তার শিকার হন এবং পরবর্তীতে এলাকাবাসী তাকে দোষারোপ করে বিক্ষোভ মিছিল করে। নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, একের পর এক এমন ঘটনা প্রমাণ করছে, সমাজে এখনও নারীর প্রতি বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বৈষম্যমূলক।
রামপুরা থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বুধবার (২ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে বনশ্রী ই-ব্লকের ৩ নম্বর রোডের এক জুসের দোকানে ওই নারী, তার ছোট ভাই ও বন্ধু অবস্থান করছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি বারবার ওই নারীর দিকে তাকাচ্ছিল। বিষয়টি জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি উত্তেজিত হয়ে চিৎকার শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে তারা দোকান থেকে বের হয়ে আসেন এবং তাদের সঙ্গে তর্কে জড়ান।
এ সময় দোকানের বাইরে থাকা তিন যুবক— সোয়েব রহমান জিশান, মো. রাইসুল ইসলাম ও মো. কাউসার হোসেন কটূক্তি করলে ভুক্তভোগীর ছোট ভাই প্রতিবাদ করেন। এরপর তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি এবং এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। ভুক্তভোগী ওই নারী এগিয়ে গিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলে অভিযুক্তরা তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেয় বলে অভিযোগ করেন।
ঘটনায় রাতেই ওই নারী রামপুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। পরে র্যাব রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত তিন জনকে গ্রেফতার করে।
ভিকটিম ব্লেমিং ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যরা উল্টো ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করতে শুরু করেন।
শাহী জুস বারের এক কর্মচারী লিটন দেবনাথ বলেন, ভুক্তভোগী নারী দোকানের ভেতরে দুই জন বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে তর্কতর্কির সময় তার ছোট ভাই দোকানের বাইরে অভিযুক্ত তিন যুবকের সঙ্গে তর্কের এক পর্যায়ে ‘হাতাহাতি’ হয়। তিনি বাইরে এসে উত্তেজিত হয়ে উঠলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
ফলের দোকানি বাবু ও ফুচকার দোকানি মো. কবির জানান, ওই নারী বাইরে এসে স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে উত্তেজিত হওয়ায় পরিস্থিতি থামানোর চেষ্টা করেন স্থানীয়রা। এতে তিনি আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠলে স্থানীয়রা সরে দাঁড়ান।
অভিযুক্ত জিশানের এক বন্ধুর মা রাহেলা আক্তার বলেন, ছেলেদের কোনও দোষ নেই। মেয়েটাই ইচ্ছা করে ঝগড়ায় জড়িয়েছে। মানুষ চলতে ফিরতে তাকাতেই পারে, এতে দোষের কী আছে?
ভুক্তভোগী নারীকে দোষারোপ করে গোল্ডেন স্টার হোটেলের মালিক বেলায়েত হোসেন বলেন, গতকালের ঘটনাটি পুরোপুরি তুচ্ছ বিষয়কে ঘিরে। সামান্য তাকানোকে কেন্দ্র করে এতো বড় ঘটনায় রূপ দেওয়ার মতো কিছু হয়নি। আমরা থামানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মেয়ে উত্তেজিত হয়ে খুব বাজে গালমন্দ করছিলেন। যার কারণে আমরা আর ঘটনাস্থলে থাকতে পারিনি।
নারী অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
বনশ্রীর ঘটনাটি সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নারী অধিকার সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীরা একে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ধারাবাহিক অংশ হিসেবে দেখছেন।
নারী অধিকার সংগঠন ‘নারীপক্ষ’ থেকে বলা হয়েছে, এটি ভিকটিম ব্লেমিংয়ের একটি ভয়ংকর উদাহরণ। একজন নারী প্রকাশ্যে হেনস্তার শিকার হয়েছেন, অথচ সমাজ এখন তাকে দোষারোপ করছে। এটি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন।
সংগঠনটি আরও বলছে, নারীরা যদি তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলে তাহলে তাদেরই দায়ী করা হয়। এটি বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলেছে, এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সমাজের নারীবিরোধী মনোভাবের প্রতিচ্ছবি। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ভুক্তভোগী ওই নারী বলেন, ‘আমি ন্যায়বিচার চাই। আমার ওপর হামলা ও হেনস্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যেন ভবিষ্যতে আর কোনও নারীকে এমন পরিস্থিতির শিকার না হতে হয়। অভিযুক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপপ্রচার করছে, মিথ্যাচার করছে। আমাকে নানাভাবে হেনস্তার চেষ্টা করছে।’
এদিকে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে রামপুরা থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘এ ঘটনায় তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নারী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে শুধু অপরাধীদের শাস্তিই নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।