ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এক মহাতীর্থ পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার। ঢাকা শহর পত্তনের সময় থেকেই এখানে শঙ্খ আর শাঁখা বিক্রির ধারা অব্যাহত আছে। বংশ পরম্পরায় এ এলাকায় শত শত শাঁখারীর বসবাসের সূত্র ধরেই এর নামকরণ করা হয় শাঁখারীবাজার। ভালো মানের শাঁখার খোঁজে দেশের নানান প্রান্ত থেকে শাঁখা কিনতে শাঁখারীবাজারে ছুটে আসেন অগণিত মানুষ। দুর্গাপূজার সময় এখানে ভিড় অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়।
একসময় প্রাচীন পদ্ধতিতে এখানকার অধিকাংশ দোকানে নিপুণ হাতে শাঁখা তৈরি হতো। তবে এখন আগের সেই সময় নেই। হাতে তৈরি শাঁখার কদর কমেছে। এখন মেশিনে তৈরি হয় বাহারি ডিজাইনের শাঁখা। তবে মেশিনের চেয়ে হাতে বানানো শাঁখাকে টেকসই বলেছেন ক্রেতারা। কিন্তু মেশিনে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন খুব সহজেই করা যায়। হাতে সেই সুযোগ কম। তাই মানুষও এখন টেকসই না খুঁজে ডিজাইন খোঁজ করে।
সরেজমিন বৃহস্পতিবার (১৯ অক্টোবর) শাঁখারীবাজার ঘুরে দেখা যায়, শাঁখা বিক্রি করা প্রায় প্রতিটি দোকানেই ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায় 'মা মনসা শঙ্খ শিল্পালয়' নামে একটি দোকানে। সবাই পছন্দের ডিজাইনের শাঁখা কিনছেন। দোকানে ঢুকে কেউই শাঁখা না কিনে বের হচ্ছেন না। কেউ মায়ের জন্য, কেউ বউয়ের জন্য শাঁখা কিনছেন। বেশিরভাগ ক্রেতাই ৭০০ থেকে দুই হাজার টাকা দামের শাঁখা কিনছেন।
শাঁখারীবাজারে শাঁখা কিনতে আসা পুষ্প রানী বলেন, এক জোড়া শাঁখা কিনেছি ১৫০০ টাকা দিয়ে। অনেক ধরনের শাঁখাই আছে। তবে টেকসই বা সুন্দর ডিজাইনের শাঁখার দাম তুলনামূলক বেশি। দাম বেড়েছে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ভালো মানের শঙ্খ দিয়ে তৈরি শাঁখার দাম একটু বেশি হবেই। তবে অত বেশি দাম বাড়েনি। আগের মতোই আছে।
পূজায় নতুন শাঁখা কেনার বিষয়ে শাঁখারী বাজারের বাসিন্দা শিলা নন্দি বলেন, আমি সবসময় অষ্টমীতে নতুন শাঁখা পরি। অষ্টমীতেই যে নতুন শাঁখা পরতে হয় এমন কোনও নিয়ম নেই। তবে আমার মা-পিসিরা সবসময় অষ্টমীতেই নতুন শাঁখা সিঁদুর পরেন। সে থেকেই আমাদের পরিবারে একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে। একসময় পূজায় নতুন নতুন জিনিস কেনার অনেক ইচ্ছে থাকতো। কিন্তু এখন ছেলেমেয়েদের ইচ্ছে পূরণ করাই আমাদের ইচ্ছে।
পূজায় নতুন শাঁখা কেনা ছাড়া আর কোনও জিনিসের প্রতি বেশি আগ্রহ থাকে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পূজা এলে ছেলেমেয়েদের জন্য পোশাক থেকে শুরু করে নানান কিছু কিনতে হয়। আমরা কিছু কিনি আর না কিনি, শাড়ি আর শাঁখা সিঁদুর কিনতে হয়। বিষয়টা এমন নয় যে শুধু পূজায় শাঁখা কেনা হয়। অন্য সময়ও নতুন শাঁখা সিঁদুর পরি। কিন্তু পূজা এলে সবাই কেনে তাই আমিও কিনি, নয়তো পুজো-পুজো ভাবটা আসে না।
শাঁখারীবাজারের শাঁখা বিক্রেতা সন্তোষ নন্দি জানান, দুই দিন ধরে শাঁখা বিক্রির ধুম পড়েছে। আমি বলবো না যে আমার কম বিক্রি হয়েছে। আমার পুঁজি যেমন বিক্রিও তেমন। শাঁখারীবাজারের প্রায় প্রতিটি শাঁখার দোকানে উপচে পড়া ভিড়। পূজার সময়টাতে এমন কোনও পরিবার নেই, যারা নতুন শাঁখা কেনে না। ধনী-গরিব সবাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী শাঁখা কিনে। এখানে একজোড়া শাঁখার দাম ৩০০ টাকাও আছে। আবার একজোড়া ১৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আছে।
এদিকে, শাঁখারীবাজারের ঐতিহ্য হাতে তৈরি শাঁখার কদর কমার কারণ জানতে কথা হয় স্থানীয় শাঁখাশিল্পী স্বপন নাগের সঙ্গে। তিনি জানান, একসময় এর অনেক মূল্য ছিল। মজুরিও ছিল অনেক। বিয়ের জন্য আমাদের বাবুরা মেয়ে দেখতে গেলে যখন শুনতো শাঁখার কাজ করে, তখন তারা অনেক সম্মানিত মনে করতো। কিন্তু এখন আর সেই সময় নেই। হাতে তৈরি শাঁখার প্রচলন অনেক কমেছে। তাছাড়া যে মজুরি পাই তাতে এখন সংসার চালানো কষ্টকর। হাতে তৈরি শাঁখার প্রচলন কমেছে কেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, হাতে একজোড়া শাঁখা তৈরি করতে যে সময় ব্যয় হয়, মেশিনে ওই সময়ে দশ জোড়া শাঁখা বানানো যায়। আর হাতে মেশিনের মতো বাহারি ডিজাইন করা যায় না। তাছাড়া মজুরি কম হওয়ায় এখন কেউ শাঁখা তৈরির কারিগর হতে চায় না।
ছবি: প্রতিবেদক