চলতি বছরের ১২ আগস্ট মুরগির ডিমের দাম তদারকির লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকার একাধিক এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এ সময় ডিম কেনাবেচার ক্যাশমেমো বা রসিদ না থাকাসহ একাধিক কারণে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে ৩২ হাজার টাকা জরিমানা করে সংস্থাটি। ডিমের দাম বেশ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই অভিযান চালানো হয়।
এদিকে বুধবার (৬ সেপ্টেম্বর) ডিমের বাজারে কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি করে বাড়তি মুনাফা করায় ছয় কোম্পানি ও চার বাণিজ্যিক অ্যাসোসিয়েশনের (সমিতি) বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন (বিসিসি)। বিসিসির একটি অনুসন্ধানী দল বাজার থেকে তথ্যসংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানী দলের প্রাপ্ত তথ্যে উঠে এসেছে— বেশ কিছু কোম্পানি ও তাদের সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলো এসএমএসের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বাড়তি মুনাফা করেছে।
প্রশ্ন হলো, ভোক্তার অধিকার ও প্রতিযোগিতা কমিশন কি একই কাজ করছে? প্রতিষ্ঠান দুটোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাত দৃষ্টিতে কাজ একইরকম মনে হলেও ভিন্নতার জায়গা অনেক। ভোক্তা অধিকার বাজারে সরেজমিনে গিয়ে ভোক্তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে— এমন বিষয় পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা করতে পারে। আর প্রতিযোগিতা কমিশন একটা দীর্ঘমেয়াদি তদন্ত ও মামলার দিকে যায়। সেইসঙ্গে কমিশন বাজার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাড়তি মুনাফা রোধে কাজ করে থাকে।
প্রতিযোগিতা কমিশন কেন?
প্রতিযোগিতা কমিশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, একটি আধুনিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো— ব্যবসা ও বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি স্বাভাবিক রেখে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা বজায় থাকলে তা পণ্যের দাম কমাতে সাহায্য করে। বাজারে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশে প্রতিযোগিতা আইন করা হয়। বাংলাদেশ ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার পণ্য ও পরিষেবার উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ, সঞ্চয় বা অধিগ্রহণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে কারসাজি করে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বা হ্রাস নতুন কিছু না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে লাভবান কিংবা মনোপলির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা পুরনো একটি সমস্যা। সবসময় রাষ্ট্রের চেষ্টা থাকে— কেউ যেনো এককভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, বা পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে কোনও মনোপলি ব্যবসা করতে না পারে। এ রকম উদ্দেশ্যের কথা বলেই ২০১২ সালে পূর্ববর্তী ‘মনোপলিস অ্যান্ড রেসট্রিকটিভ ট্রেড প্র্যাকটিসেস (কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন) অর্ডিন্যান্স-১৯৭০’ বাতিল করে ‘প্রতিযোগিতা আইন-২০১২’ প্রণয়ন করা হয়।
তাহলে ভোক্তা অধিকার দরকার কেন?
প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের কাজ একই রকম মনে হলেও সেটা যে সঠিক নয়, তা বুঝা যায় ভোক্তা অধিকার ফোরামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের কাজ বাজার তদারকির মাধ্যমে ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ, ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং জন সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সচেতনতামূলক সভা সেমিনার ও ওয়ার্কশপের আয়োজন। ক্রেতারা পণ্য ও সেবা পেতে গিয়ে নানা ছলনা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে অতিরিক্ত মূল্য দিতে বাধ্য হচ্ছেন, প্রতারিত হচ্ছেন দশকের পর দশক ধরে। মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত অধিকার ও সেবাগুলোকে ভোক্তা অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে জাতিসংঘ। তারই আলোকে অন্যান্য দেশে ভোক্তার অধিকারের সুরক্ষা দিতে আইন প্রণয়ন ও এর প্রয়োগ শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে।
কাজের পার্থক্য কী
যোগাযোগ করা হলে প্রতিযোগিতা কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্ত উইংয়ের উপসচিব এস এম তারিকুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাজার বুঝতে নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বিষয়ে আমরা পর্যালোচনা করে থাকি। বাজার প্রতিযোগিতাবিরোধী কিনা, তা বুঝতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয় নিয়মিত। তদন্ত করে অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ ভোক্তা অধিকারের সঙ্গে কাজের পার্থক্য কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে যদি জানতে পারি যে, কোনও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করছে— তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলার ব্যবস্থা করি। সেক্ষেত্রে মামলা করলে অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান, আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন।’
প্রতিযোগিতা কমিশনের সঙ্গে কাজের জায়গায় মিল কেমন—জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মাসুম আরেফিন বলেন, ‘দুই প্রতিষ্ঠানের কাজ হয়তো একই জায়গায়। কাজের পদ্ধতি ও কার্যকর করার বিষয়টাতে বেশকিছু অমিল আছে। আমরা বাজারে গিয়ে ভোক্তার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে— এমন প্রডাক্টের মেয়াদ, মান এমন কিছু বিষয় আছে, সেগুলো দেখে জরিমানার ব্যবস্থা করি। আর প্রতিযোগিতা কমিশন ঘটনা শুনে অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে মামলা করে এবং আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করে।’