সংবিধান সংশোধন নিয়ে সংসদে ফের আলোচনা, জুলাই সনদ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিমত

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
৩০ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৪৩আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৪৩

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকারি দল। অন্যদিকে, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণের সঙ্গে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনের কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে না বলে জানিয়েছে বিরোধী দল। এ নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়েছে।

রবিবার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন এবং সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে ১০ কমিটির সভাপতি পদ দিতে চাই

আলোচনায় সূত্রপাত ঘটিয়ে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে বলেন, বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে ফোনালাপের ভিত্তিতে তিনি আশা করেছিলেন, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে থাকবে। এ বোঝাপড়ার কারণে রবিবার কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল।

চিফ হুইপ বলেন, “বিগত ৫৪-৫৫ বছরে বিরোধী দল থেকে কোনও কমিটির, পাবলিক অ্যাকাউন্টস বাদে, সভাপতি করার রেওয়াজ নেই। তারপরও আমরা আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতি পদ দিতে রাজি আছি। কিন্তু আমাদের কথা ছিল, সংবিধান সংশোধন করেই আমরা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করব। উনারা যদি সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তবে আমরা পদ দিতে রাজি আছি। আমরা কোনো কিছু আটকে রাখতে চাই না।”

তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি দিল খুলে কথা বলি, তবে অপরপক্ষকেও ওপেন হার্ট হতে হবে। কথার মারপ্যাঁচ করে আমরা দেশ গঠনের কাজে এগোতে পারব না।’

তবে চিফ হুইপের বক্তব্যের পরই বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের স্পষ্ট করে বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কোনও সমঝোতা হয়নি।’

‘শর্ত দিয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ চাই না’

বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘সংসদে আমাদের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী আমরা ২৬ শতাংশ স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য পদ পাচ্ছি। একইভাবে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, কমিটিগুলোর সভাপতিও ২৬ শতাংশ বিরোধী দল থেকে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রণালয়ের কমিটিতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হয়নি।’

চিফ হুইপের সঙ্গে ফোনালাপের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আমরা যাব এবং সেই হিসেবে আপনি আমাদের সভাপতি দেবেন, এমন কথা আমরা কখনোই বলিনি। আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো, আমরা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণ করব না। একটি কমিটিতে জয়েন করানোর জন্য শর্ত আরোপ করে জোর-জবরদস্তি করার ট্র্যাডিশন আমরা সঠিক মনে করি না।’

অতীত সংসদের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘অতীতে তো স্পিকারকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী সাহেবকে হত্যা করা হয়েছে, জুতা ছোড়াছুড়ি হয়েছে। আমরা সেই কালো ইতিহাসে ফিরে যেতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন এটা জনগণের সংসদ, তাই বৈষম্যবিরোধী এই সংসদে আমরা আমাদের অধিকার চাই।’

‘জুলাই সনদ চাইবেন, আবার বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবেন না

বিরোধী দলের অবস্থানের পর ফ্লোর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, স্পিকার নির্বাচনের আগে একটি ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কথা প্রসঙ্গে আমাদের কথা উঠলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমরা এখন থেকেই জুলাই জাতীয় বাস্তবায়ন শুরু করি। চলুন, আপনি ডেপুটি স্পিকারের একজনের নাম দিন। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার একজন, ডেপুটি স্পিকার একজন। সেই ডেপুটি স্পিকার আমরা বিরোধী দলকেই অফার করেছি।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হবে ততদিন আমরা অপেক্ষা করিনি।’ তবে বিরোধী দল তখন ডেপুটি স্পিকারের পদ নিতে রাজি হয়নি বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তখন আমরা ভাবলাম, জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে, অর্থাৎ সংবিধান সংশোধিত হলে সেই অনুযায়ী আমরা যাবো। আমরা আমাদের উদারতা এবং আমাদের উইলিংনেস জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সংবিধান সংশোধনের আগে থেকেই ব্যক্ত করেছি।’

পাঁচজন বিরোধী সদস্যের জায়গা রাখা হয়েছে

সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেজন্য আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি আন্ডার রুলস ২২৬ আমরা গঠন করেছি। পাঁচজন সদস্যের জায়গা রাখা হয়েছে বিরোধী দলের জন্য।’

তিনি বলেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল অন্যান্য রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র সদস্যসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্বও কমিটিতে রাখা হয়েছে। বিরোধী দল নীতিগতভাবে কমিটিতে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হতেই পারে। যদি সংবিধান সংশোধিত না হয়, জুলাই জাতীয় সনদ তো বাস্তবায়িত হলো না। হওয়ার পরে হবে। আমরা কাজ শুরু করেছি, সেই কমিটি গঠিত হয়েছে।’

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তার সভাপতিত্বে কমিটির একটি বৈঠক ইতোমধ্যে হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করবে।

তিনি বলেন, ‘তার মধ্যে সংবিধান বিশেষজ্ঞ আছে, সাবেক প্রধান বিচারপতিগণ আছেন, বিচারপতিগণ আছেন, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন আছেন। এবং প্রেসের বন্ধুরা আছেন, এডিটরস আছেন। জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সঙ্গে যারা কাজ করেছেন, জড়িত, তাদেরকেও আমরা আহ্বান জানাব।’

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘এভাবে আমরা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলব। তাদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা রিপোর্টটা প্রণয়ন করবো।’

‘সমৃদ্ধ সংবিধান সংশোধনী বিল আনবো’

পরে আইন মন্ত্রণালয় ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উপস্থাপন করা হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদকে সামনে রেখে, জুলাই জাতীয় সনদের বাইরেও সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমাদের নির্বাচন ইশতেহার অনুযায়ী এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আর যাদের সঙ্গে আমরা কথা বলব, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সবকিছু ধারণ করে আমরা একটা সমৃদ্ধ সংবিধান সংশোধনী বিল আনবো।’

‘আপনাদের বক্তব্য জাতি জানবে’

বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন। আপনাদের যা বক্তব্য আছে, আমরা সেটা লিপিবদ্ধ করব। আপনাদের সমস্ত রিপোর্ট, বক্তব্য সেই রিপোর্টে থাকবে। আপনাদের বক্তব্য জাতি জানবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা দ্বিমত হবেন, ভিন্নমত হবেন এবং কিছু কিছু প্রস্তাবে অবশ্যই একমত হবেন। আমরা তো আরও কিছু জিনিস এখানে অন্তর্ভুক্ত করব এই সংবিধানে। যেগুলো আপনারা দেন বা অন্য পেশার মানুষ দিক, সেটা নতুনত্ব আসতে পারে। সেটা আমরা গ্রহণ করব। আমরা ভেরি ওপেন এই বিষয়ে।’

‘সকল দাবি মানতে হবে, এটা সহযোগিতা হলো না’

সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়টিও জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে যুক্ত বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য, সনদে সংসদীয় কমিটির সভাপতিত্ব বিরোধী দলকে দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য আগে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সকল দাবি মানতে হবে, তারপরও আমরা আপনাদের এই সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসবো না, এটা সহযোগিতা হলো না। আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা যখনই অংশগ্রহণ করবেন, আমরা স্বাগত জানাব। তখন জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে। তার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান বিধান অনুসারে আমরা যাই।’

সবশেষে বিরোধী দলের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আপনারা সবই জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চাইবেন, অথচ সনদ বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতায় আসবেন না। দুইটা বিপরীতমুখী হয়ে যায়।’

/এসএমএ/ইউএস/
সম্পর্কিত
শর্ত দিয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ চাই না: সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা
জুলাই সনদ চাইবেন, কিন্তু বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবেন না—দুইটা বিপরীতমুখী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
‘সকালে ৬ হাজার বিকালে ১২ হাজার’, অভ্যন্তরীণ বিমানভাড়া নিয়ে সংসদে প্রশ্ন
সর্বশেষ খবর
ঢাকায় পৌঁছেছেন আইপিইউর সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ফিলিপ
ঢাকায় পৌঁছেছেন আইপিইউর সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ফিলিপ
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ
২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন, ব্যবসায়ীরা ঋণ পাবেন ৭ শতাংশ সুদে
২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন, ব্যবসায়ীরা ঋণ পাবেন ৭ শতাংশ সুদে
মন্ত্রণালয়ে আরেকটু বোঝার পরই সিদ্ধান্ত নেবো কীভাবে দুর্নীতি সরানো যায়: খাদ্যমন্ত্রী
মন্ত্রণালয়ে আরেকটু বোঝার পরই সিদ্ধান্ত নেবো কীভাবে দুর্নীতি সরানো যায়: খাদ্যমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
আজ স্বর্ণের দাম কত
আজ স্বর্ণের দাম কত
রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজ হওয়ার কারণ জানা গেলো ল্যাব পরীক্ষায়
রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজ হওয়ার কারণ জানা গেলো ল্যাব পরীক্ষায়
‘ছয় মাস চলে গেলো, আর কয় মাস লাগবে?’
‘ছয় মাস চলে গেলো, আর কয় মাস লাগবে?’
দেশে ফিরছেন মির্জা আব্বাস
দেশে ফিরছেন মির্জা আব্বাস
‘বিঘায় লাভ দেড় লাখ’, আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত কৃষকরা
‘বিঘায় লাভ দেড় লাখ’, আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত কৃষকরা