জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আবাসন সংকট নিরসনে কেরানীগঞ্জের ৭ একর জমিতে প্রায় ১,৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য অস্থায়ী আবাসন নির্মাণে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর নেওয়া ওই প্রকল্পের মাধ্যমে দ্রুত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার আশ্বাসও দেওয়া হয়। তবে প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। এরই মধ্যে একই অর্থে অস্থায়ী আবাসনের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ১০ তলাবিশিষ্ট স্থায়ী ছাত্রহল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসনের দাবি, নতুন ভবনে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে। ফলে প্রকল্পের ধরন পরিবর্তন এবং ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসনে অতিরিক্ত ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাত একর জমিতে অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
আবাসন সংকট নিরসনের দাবিতে গত বছরের মে মাসে আন্দোলনে নামেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ১৪ মে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে আবাসন সংকটের পাশাপাশি ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন বৃত্তি, পূর্ণাঙ্গ বাজেট অনুমোদন এবং দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিও ছিল। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৬ মে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। পরে কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাত একর জমিতে দ্রুত অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই প্রকল্পে প্রায় ১,৬০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য টিনশেডভিত্তিক অস্থায়ী আবাসনের একটি প্রাথমিক নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছিল।
কিন্তু প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। এর পরিবর্তে গত ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ই-টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে একই স্থানে ১০ তলাবিশিষ্ট ছাত্রহল নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭ একর জমির মধ্যে মাত্র ৫৪ শতক জমির ওপর ভবনটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ পুরো জমির তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট একটি অংশে ভবন নির্মিত হবে। ফলে অবশিষ্ট বড় অংশ আপাতত অব্যবহৃত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্পের ধরন পরিবর্তনে ক্ষোভ প্রকাশ করে ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, "আমাদের বলা হয়েছিল তিন মাসের মধ্যে থাকার ব্যবস্থা হবে। এখন সেটি কয়েক বছরের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমান শিক্ষার্থীরা এর সুবিধা পাবেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।"
তিনি বলেন, "আমাদের চতুর্থ বর্ষ চলছে। এই সময়ে অস্থায়ী হল হলে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু স্থায়ী ভবনের জন্য অপেক্ষা করতে হলে অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে চলে যাবেন।"
আরেক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, "যদি স্থায়ী হলই নির্মাণ করা হয়, তাহলে সেটি দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে হবে। কেরানীগঞ্জের সাত একর জমিতে কেন স্থায়ী হল করা হচ্ছে?"
প্রশাসনের ব্যাখ্যা
প্রকল্প পরিবর্তনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, অস্থায়ী নাকি স্থায়ী প্রকল্প হবে, সেই সিদ্ধান্ত প্রকৌশল দপ্তরের নয়; এটি ওয়ার্কস কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়েছে। প্রকৌশল দপ্তর কেবল বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অস্থায়ী টিনশেড আবাসনের পরিবর্তে ১০ তলা স্থায়ী ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে। ভবিষ্যতে ভবনটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রয়োজনেও ব্যবহার করা যাবে।
তবে অস্থায়ী প্রকল্পে ঠিক কতজন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হতো, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। যদিও শিক্ষার্থীদের দাবি, ওই প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৭৪০ জনের আবাসনের পরিকল্পনা ছিল।
অপরদিকে প্রকল্প পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (ডিরেক্টর ইনচার্জ) সৈয়দ আহমেদ। তিনি বলেন, অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পকে স্থায়ী ভবনে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তারা অবগত নন। এমনকি এ বিষয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে কি না, সে তথ্যও তাদের কাছে নেই।
তিনি আরও বলেন, ২০ কোটি টাকার বরাদ্দ এসেছে কি না, সে বিষয়েও তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তাদের ধারণা ছিল, অর্থটি রাজস্ব খাত থেকে আসবে। এছাড়া অস্থায়ী টিনশেড আবাসনের জন্য একটি প্রাথমিক নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন অবশ্য বলেন, অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে স্থায়ী ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। বিষয়টি একাধিক সভা ও সংশ্লিষ্ট কমিটিতে দীর্ঘ আলোচনা শেষে চূড়ান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, যেহেতু বরাদ্দ পাওয়া গেছে, তাই সাময়িক অবকাঠামো নির্মাণ করে পরে তা ভেঙে ফেলার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভবনটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন, ভাড়াভিত্তিক ব্যবহার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন ও সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া
জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ২০ কোটি টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একতরফাভাবে ১০ তলা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার দাবি, এই অর্থ দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রশাসন প্রায় দুই মাস অর্থটি অব্যবহৃত রেখে এখন প্রকল্পের ধরন বদলে দিয়েছে। তিনি এ সিদ্ধান্তকে শিক্ষার্থী-বিরোধী, অপরিণামদর্শী এবং সম্ভাব্য অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টিকারী বলেও মন্তব্য করেন।
জাতীয় ছাত্রশক্তি জবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ বলেন, "আবাসন সংকট দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যেই অস্থায়ী হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সেটিকে স্থায়ী ভবন প্রকল্পে রূপ দিয়েছে।"
জকসুর সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেরানীগঞ্জের সাত একর জমিতে অস্থায়ী আবাসনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ২০ কোটি টাকার মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত আবাসন সংকট নিরসন এবং প্রায় ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা করা। কিন্তু এখন সেই প্রকল্প পরিবর্তন করে এমন একটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ ৬০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সংকট যখন আবাসন, তখন দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য দ্রুত আবাসনের ব্যবস্থা করাই জরুরি ছিল।
তবে ভিন্ন মত দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল। তিনি বলেন, শুরুতে এটি অস্থায়ী আবাসনের প্রকল্প হলেও প্রশাসন যে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধানে এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে বেশি কার্যকর হবে এবং সরকারি অর্থেরও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভান তাহসীব বলেন, "জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সংকটই আবাসন। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনও আবাসিক হল নেই, তাই দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী প্রকল্পের চেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আবাসনের ব্যবস্থা করাই বেশি প্রয়োজন ছিল।"








