[জীবজ্যামিতি। মানুষজ্যামিতি। দেহজ্যামিতি।]
যে অংশ কেটে ফেলা হয়েছে সে অংশ বিছানার যে জায়গাটা দখল করে থাকত সে জায়গাটা এখন ফাঁকা। সে ফাঁকা জায়গার দিকে তাকায়। তার চোখ বিস্ফারিত হয় বিস্ময়ে, ঐ ফাঁকা জায়গাতে একটা বই। বইয়ের নাম ‘জীবজ্যামিতি’। এরকম বই তো সে কোনোদিন দেখেনি। ছাপাখানাতে যখন কাজ থাকত না তখন বসে বসে সে বই পড়ত। পাঠাগার থেকে বই এনে বাড়িতেও পড়ত। কোনোদিন তো এমন ধরনের বই চোখে পড়েনি। বইয়ের দিকে তাকাতেই বই তার নিজের পৃষ্ঠা নিজেই উলটাতে থাকে। জীবন্ত বই নাকি! তার চোখের কানে কানে সে বলে। তার চোখ তাজ্জব হয়ে বইয়ের নিজে নিজে পাতা উলটানো দেখে। বইটাতে কোনো পৃষ্ঠাঙ্ক দেওয়া নেই। যেখানে সাধারণত পৃষ্ঠাঙ্ক থাকে সেখানে একই সাথে লেখা—‘এখানেই শুরু এখানেই শেষ’।
যে পৃষ্ঠাতে গিয়ে জীবন্ত জ্যামিতি বই পৃষ্ঠা উলটানো থামায় সে অধ্যায়ের নাম ‘মানুষজ্যামিতি’। সেখানে দেখে একটা লম্বচিত্র। শ্রীদামের মুখে হাসি ফুটে ওঠে, এক সরলরেখার ওপর আরেক সরলরেখা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে সেটা লম্ব। সে কতদিন লম্ব হয়নি। তার লম্ব হবার জন্য মন খুব ছটফট করে। তার খুব ইচ্ছে করে ওঠে একটা লম্বা দৌড় দিতে, যেদিকে ইচ্ছে। সে লাফিয়ে উঠতে চাইছিল লম্ব হবার জন্য। শরীরটা একটু নড়ে না। অসম্ভব। সে জীবন্ত পাথর; নড়তে পারবে না কিন্তু ব্যথা অনুভব করবে। সে মুচকি হাসে। তার ঠোঁট হাসিতে ভরে যায়। সে হেঁচকি তুলে কাঁদে। তার চোখ জলে ভরে ওঠে। সে তার ঠোঁট থেকে হাসি থামানোর চেষ্টা করে; সে তার চোখ থেকে জল ঝরা বন্ধ করার চেষ্টা করে। দ্বিগুণ ধীগুন বাড়াতে হবে; শগুন সহ্যগুন বাড়াতে হবে।
সে তার কাটা পায়ের যে অংশ নেই সে অংশের ফাঁকা জায়গার দিকে তাকায়। জায়গাটা ফাঁকা আছে। সেখানে ‘জীবজ্যামিতি’ বইটা নেই। কিছুক্ষণ পর মাধবীকে ডাকে শ্রীদাম।
মাধবী ঘরে গেলে বলে—‘মা রে কিছু কি খেতে পাই নে?’
[ক্ষুধা ও খাদ্য দুবন্ধু। দুরসিক। তারা মানুষকে নিয়ে হাসাহাসি করে।]
শুধু বাবার ক্ষুধা পেয়েছে এমন নয়, তারও পেয়েছে প্রচুর। মাধবী রান্না করার জন্য কিছু পাওয়া যায় কি না সে চেষ্টা করতে কিছু পূর্বেও ঘুরে এসেছে কিন্তু ঝোপঝাড়ে কচু, কাঁচড়া, নটে বা কাঁটানটে, শুলফা, ঢেঁকিশাক কোনোরকম শাকেরই দেখা মিলেনি। দেখা মেলেনি ওল বা মানকচু বা দলকচুর। শুকনো দুএকটা গড় আলু আর গুইচা আলুর গাছ দেখেছে, মাটি খুঁড়ে এ মেটে-আলু বের করা তার পক্ষে সম্ভব না; দুএকটা পাতাশি পেলেও হতো কিন্তু সেগুলো কুড়িয়ে পুড়িয়ে খাওয়ার জন্য ছোটোরা মুখিয়ে থাকে, তারাই আগে কুড়িয়ে নেয়; পাওয়া যায় না।
সে ডানদিকের জলাভূমির দিকেও গেছিল, শুশনি, হিঞ্চা বা কড়ম্বের সন্ধানে। সন্ধান মেলেনি; জলাভূমি জ্বলাভূমি হয়ে আছে। তার বাবা অসুস্থ হওয়ার আগে এগুলোকে কতশত বার হেলায়ফেলায় পথে ঘাটে পায়ে পায়ে ঠেকতে দেখেছে কিন্তু এখন যেন তারা লুকিয়ে পড়েছে ইঁদুর বা শজারুর মতো গর্তে গর্তে। খাদ্য-খাবার মানুষের সাথে লুকোচুরি খেলে। খাদ্য একই সাথে রস আর রসিক, লুকোচুরি খেলতে গিয়ে ক্ষুধার্তের হাতে ধরা পড়লে খাবারটি রস হয় আর ধরা না পড়লে নির্দয় রসিক হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে হাসে। খাবারের হাসি শুনে ক্ষুধার্ত মানুষ বড়ো বেদনা পায়। ক্ষুধার্ত মানুষ ঘৃণা আর অবিশ্বাস নিয়ে চারদিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায় লুকিয়ে লুকিয়ে খিকখিক করে হাসতে থাকা খুনি খাদ্যধনের মুখটা একবার দেখার জন্য।
অনেক খুঁজাখুঁজি করেও তার কাঁকালের চুপড়িতে সে কিছুই ভরতে পারেনি। সে একলা একা দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকায় ব্যথিত চোখে; এতকিছু চারদিক ঘিরে; গাছপালা, মাটি, ইটপাটকেল, টুটাফুটা জুতা খড়ম, ন্যাকড়া, পাখির পালক, ইঁদুরের নাদি, বিড়ালের গু, ঝরা পাতা, সাপের খোলস, বাচ্চা ফুটে বের হওয়া ভাঙা ডিমের খোলা আরো কতকিছু অগাধ; শুধু খাদ্য-খাবার কিছু নেই। সে তাকায় হতবাক হয়ে, হতবল হয়ে দাঁড়িয়ে।
একটা গুঁইসাপ তার দিকে তাকিয়ে চোখটিপি দিল; চোখ মারল? চোখ মারে তো পুরুষমানুষ নারীমানুষদের। স্কুলে যাওয়া-আসার সময় কতবার সে নিজে পুরুষের চোখ মারার শিকার হয়েছে। বনের পুরুষ পশুরাও মানুষনারীর দিকে আলাদা করে তাকায় নাকি! পুরুষ পিঁপড়া বা কাঠবিড়াল বা বিড়াল বা পথের কুকুররা। সুঁইমুখো গুইসাপের চাউনি তার ভালো লাগেনি। সে খালি চুপড়ি হাতেই বাড়ি ফিরবে বলে ভাবছিল। কিন্তু ফিরল না। বাবার কথা ভেবে সে আরো একটু দূরের জঙ্গলে যায়। আরেকটু গভীরে।
সেখানেও একইরকম প্রায়, শুকনো পুষ্প আর শুষ্ক পাতার প্লাবন পুরো বন জুড়ে। তার চোখ ধাঁধিয়ে ওঠে।
হঠাৎই সে একটা বনমুরগিকে বসে থাকতে দেখে। এ অঞ্চলে তো বনমুরগি নেই। এখানে বনমুরগি এলো কোথা থেকে। ‘যেখান থেকেই আসুক’ সে তার মনের পায়ে হাতে ধরে বলল—‘একে ধরতে পারলে ভালো হবে।’ ক্ষুধায় তার ভেতর ঝাঁঝাঁ করছে। চোখে অন্ধকার দেখছে। বনমুরগির গা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে। বনমুরগির গা থেকে ঠিকরানো আলোর ঝলকানিতে তার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। চোখ তার একরকমকিছুকে আরেকরকমকিছু দেখছে। তার চোখ দেখছে না পেট দেখছে তা সে নিজেই বুঝতে পারছে না।
মানুষের চোখও দেখে, পেটও দেখে?
একই জিনিস চোখ দেখে একরকম, পেট দেখে আরেকরকম?
সে কাঁক থেকে চুপড়িটা সন্তর্পণে নামিয়ে রাখে। চুপি চুপি ঘুরা পথে এগোয়। একটুও শব্দ করা যাবে না। শব্দ করলেই পালিয়ে যাবে। পায়ের পাতার তলে শুকনো পাতার মচমচানি ওঠে। সে সতর্ক হয় আরো। মচমচ শব্দকেও পায়ের তলে চাপা দিয়ে রাখে, মচমচ শব্দটার গলায় পা চাপিয়ে রাখার ফলে মচমচ-শব্দটা আর মচমচ শব্দ করতে পারে না শুধু হালকা মচ শব্দ করে চুপ হয়ে যায় বা মরে যায়; মচমচ শব্দ মরে গেছে বা বোবা হয়ে গেছে মনে হলে তখন মাধবী পা তুলে আবার বাড়ায় সামনে। তার পা এমনভাবে উঠছে নামছে যেন পা দুটো বেশ মেধাবী; অল্পতেই সাবধানতা শিখে গেছে।
মুরগিটা কি মচমচ শব্দ পেয়ে একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিল না কি?
পালাবে মনে হয় এক্ষুনি?
সে দেখল মুরগি পালায়নি। মুরগির দুতিন হাতের মধ্যে এসে ঝাঁপ দেয়। মুরগি ধরা পড়ে। সে বাড়িতে এসে মুরগি কাটার সময় বুঝতে পারে, আরে এ-তো বাবার কাটা পা-টা। সম্ভবত ডাক্তার যাবার সময় ঝোপে ফেলে চলে গেছে। সে বাইরে ফেলতে যায়।
ক্ষুধায় তার চোখে রাজ্যের অন্ধকার নেমে আসে। ছুঁড়ে ফেলার সময় হঠাৎ আবার মনে হয়—‘তার হাতের মুরগিটাকে কেন সে ছাড়তে যাচ্ছে! ছেড়ে দেয়াটা বিরাট ভুল হয়ে যাচ্ছিল।’
বনমুরগির শরীর থেকে ঝলকানো আলো তার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। সে মুরগিটা ফিরে নিয়ে আসে। কেটে ধুয়ে রান্না করে বনমুরগি।
[মাথা ছাড়াও মানুষ বাঁচবে পা ছাড়া বাঁচবে না।]
বালিশে হেলান দিয়ে বিছানায় শ্রীদাম খাবার জন্য বসে। তার পেট চুঁইচুঁই করছে। এতটুকু তর সয় না তার। মাংসের নামে তার জিহ্বা নিজের নিঃসৃত রসেই হাবুডুবু খাচ্ছে, স্নান করছে; বহুদিন পর আজ দাঁত দিয়ে মাংস ছেঁড়ার আনন্দ পাবার উল্লাস তার ভেতর।
কাটা পায়ের শ্রীদাম খেতে খেতে বলল—‘মানুষের পা-ই সব রে মা। মাথা ছাড়াও মানুষ বাঁচবে যেমনভাবে শ্রমিক-শ্রমিকারা বেঁচে থাকে কিন্তু পা ছাড়া বাঁচতে পারে না। পা ছাড়া মানুষের পেট ভরে না, ভরতেই পারে না। অথচ আমার পা’টায় কাটা গেল।’
আবার বলে—‘একবার সুস্থ হয়ে উঠি মা, তোর সব কষ্টের কাঁটা উপড়ে ফেলব। এক পায়েই দুপায়ের কাজ করব। একাই শত শত মানুষ হয়ে যাব। এতো এতো খাদ্যখাবার আনব খেয়ে ফুরাতে পারবি না।’
বলতে বলতে সে হাসে, তার চোখ ছলছল করে। বহুদিন পর মাংস খেতে পেয়ে মাধবীরও ভালো লাগছে। তারও চোখ ছলছল করছে। মাধবীর মনে হয়, ঈশ্বর এতো ভালো কেন! কীভাবে কিভাবে ঠিক মাংস খাবার ব্যবস্থা করে দিল। পাতিলের একেবারে পাতাল থেকে শেষ টুকরোটি পর্যন্ত টেনে এনে খায় তারা।
[মারায়ন]
ধীরে ধীরে ব্যথা ঠিক হবে কি না আরো বাড়ল। রোগ যেন রেগে গেছে আরো। প্রথম দুতিন দিন ভালোই ছিল। এখন বেড়ে গেছে অনেকবেশি। প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে ব্যথার বান; প্রতি মুহূর্তে তীক্ষ্ম হচ্ছে ব্যথার বাণ।
শ্রীদাম অন্ধকার দেখে দুচোখে; কালো অন্ধকার, লাল অন্ধকার, সাদা অন্ধকার, গাঢ় নীল অন্ধকার; কতরকম অন্ধকার; এতদিন তো শুধু কালো অন্ধকারই দেখেছে; কিন্তু এখন ব্যথার উচ্চ-নিচ্চ মাত্রার সাথে সাথে অন্ধকারের রং বদলিছে।
জান বেরিয়ে যেতে চায়। বেরিয়ে যে কোথায় যেতে চায় কে জানে। জান-প্রাণ দিয়ে চোখ মুখ বুজে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করে। চিৎকার চেপে রাখার চেষ্টা করে কিন্তু বেশিক্ষণ পারে না। উচক্কা বিকট চিৎকার দিয়ে ওঠে। তার চিৎকারে পুরো ধরাধাম কেঁপে ওঠে; ঠাকুরঘরে ঠাকুর কেঁপে ওঠে; পথে আপনমনে চলে যাওয়া কুকুর কেঁপে ওঠে; কাঁপে না শুধু মাধবী; আর্ত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কাটা স্থান থেকে বদ রক্ত, পুঁজ গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে। গড়িয়ে পড়া দরানিতে বিছানা ভিজে চ্যাটচেটে হয়ে যায়। পচা মাংস থেকে দুর্গন্ধ বেরোয়, নিজের পচা মাংসের গন্ধে নিজেরই টিকে থাকা দায়। মাধবীটা যে কিভাবে সহ্য করছে কে জানে। তার মুখ চোখে কখনো বিকৃতি দেখতে পায়নি। তার ধীগুন যেন আরো দ্বিগুন বেড়ে গেছে। সহ্যগুন যেন চৌগুন বেড়ে গেছে। সে গরমজলে নরম ন্যাকড়া ভিজিয়ে রক্তপুঁজ মুছে; রক্তস্রবণ থামানোর জন্য ছেঁড়া কাপড় বেঁধে দেয়। বাপবেটি পচা তরল মাংসের ভেতর, দরানির ভেতর, দুর্গন্ধের ভেতর ডুবে থাকে।
ব্যথাতুর শ্রীদাম চিৎকার শুরু করলে মাধবী ব্যথার ওষুধ খাওয়ায়। ব্যথার ওষুধ খেলে কিছুক্ষণ ব্যথা থামে। ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়; ঘুম আসে না চোখে তন্দ্রার মতো নামে।
তন্দ্রাবিষ্ট শ্রীদাম বলে ওঠে—‘মাধবী রে মা, ঐ কাটা পা-টা বেরিয়ে আসছে রে মা, পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে, চোখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে, শ্বাসের সাথে নাকের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসছে। পা একেবারে কেটে ফেলা কী ডাক্তারের সাধ্য রে মা! মনে মনে পায়ের জায়গায় পা থেকেই যায় গো মা!’
কিছুক্ষণ থামে শ্রীদাম তারপর আবার তন্দ্রালু স্বরে বলে—‘ঐ যে চালের কড়িকাঠে কাটা পা দুলছে, যেমন করে মানুষ পা দুলায় তেমন করে দুলছে। সরলদোলকের মতো দুলছে। আমার পা আমাকে ছেড়ে একা একা কোথায় ঘুরতে চলে যায়! আমার পা আমাকে ছেড়ে কড়িতে বসে দোল খায় কেমন করে!’
একটু থেমে আবার বলে—‘চারদিকে এত বনমুরগি কেন রে মামাধবী? মুরগি করকর করে ডাকছে, পাখা ঝাপটাচ্ছে। মুরগির একঘেয়ে করকর ডাক ভালো লাগে না। তুই মুরগি তাড়িয়ে দে। মুরগি তাড়িয়ে দে মা।’
শ্রীদাম কথা বলতেই থাকে ঘোরে। মাধবী চুপচাপ চোখের জল ঝরায়। বাবার কষ্ট আর তার সহ্য হয় না, বাবার ব্যথা তাকে ব্যত্যস্ত করে তোলে।
[চুপচাপ চিৎকার]
জেগে থাকলে শ্রীদাম তাড়সে চিৎকার পাড়ে; কথা বলে না; চুপচাপ শুধু চিৎকার করে।
আর তন্দ্রাবেশে থাকলে বা ঘুমিয়ে থাকলেও অনবরত বকতে থাকে—‘মাধবীমা, আমার নতুন ফতুয়াটা দে তো, প্রেসে যেতে হবে, কত বেলা হয়ে গেল। মালিক কী বলবে এত দেরি করে গেলে? মালিক তো আমার ওপরেই নির্ভর করে বেশি, আমার মতো কেউ তো ভালো অক্ষর বসাতে পারে না। বেলা বেড়ে গেল, এখনো তোর মায়ের রুটি বেলা হয়নি? তাড়াতাড়ি রুটি সেঁকতে বল তোর মাকে।’
একটু দম নেয় শ্রীদাম।
আবার শুরু করে—‘কই রে মাধবী, তোর মা কোথায় গেল? ঐ যে চালের কড়িকাঠে আমার পা ঝুলছে, ঐ পা পেড়ে এনে তোর মাকে আমার হাঁটুর সাথে জোড় দিয়ে দিতে বল। ভালো করে কাটা পায়ের কাছে কেটে ফেলা পা লাগাতে বলিস। তোর মা যা ভুল করে। ভুল করে কাটা পা যেন মাথার সাথে লাগিয়ে না দেয়, বুকের সাথে লাগিয়ে না দেয়, পেটের সাথে লাগিয়ে না দেয়। তুই দেখে থাকিস মাধবী।’
একটু চুপ করে থেকে আবার বলে—‘দেয়ালের ঝুলনা থেকে ফতুয়াটা এনে গায়ে পরিয়ে দিতে বল তোর মাকে; প্রেসে যাব; মালিক মন খারাপ করবে।’
মাধবী ভাবে, বাবার প্রেসের মালিক, তার মা, পাড়াপড়শি সকলেই প্রায় একই। মা ভেগে গেছে নিজ শরীর নিয়ে। মালিক ভেগে আছে চুপকথার ভেতর চুপচলাচলের ভেতর।
যে মালিক বাবাকে বলতো—‘তোমাকে ছাড়া প্রেসই চলবে না, মুদ্রণসৌকর্যের যে সুনাম আমাদের ছাপাখানার আছে সে তোমার জন্যই।’
সে মালিকও তো একদিন এসে দেখে গেল না। শুধু ভালো কথা বলে, প্রশংসা করে বেশি করে কাজ করিয়ে নেবার ধান্দাই ছিল তার; এটা তার বাবা কোনোদিন বোঝেনি। মালিকের প্রশংসায় খুশি হয়ে মুদ্রণসৌকর্য বাড়াতে, মুদ্রণবিভ্রাট এড়াতে, মালিকের টাকা আয়ের চাকা গড়াতে বেশি বেশি কাজ করতে গিয়ে কখনো কখনো অনেক রাতে ফিরত।
মা রেগে গেলে বলত—‘আরে তোমরা বোঝ না, আমি ছাড়া ভালো কাজ কেউ পারে না, আমি না থাকলে প্রেসই বন্ধ হবার জোগাড় হয়।’
মালিকের কথা শুনে শুনে সে নিজেও বিশ্বাস করা শুরু করেছিল যে তাকে ছাড়া প্রেস বন্ধ হয়ে যাবে। না, প্রেস বন্ধ হয়নি। প্রেস দিব্যি চলছে; মুদ্রণকার্য, মুদ্রণসৌকর্য সব অটুট আছে। দিব্যি পোস্টার ছাপার কাজ চলছে; পাইকা হরফে বই বের হচ্ছে; মানুষের আত্মমরণী বের হচ্ছে।
[জিহ্বা ঘুমা। জিব আরেক জীব। কথা শোনে না। ঘুমায় না।]
কত কী বলতেই থাকে শ্রীদাম।
শ্রীদাম বলে—‘মা রে, শরীরের সাথে পায়ের যে অংশ লেগে আছে সে অংশ, না যে অংশ কেটে ফেলেছে সে অংশ ব্যথা করছে বুঝতে পারছি না। একবার মনে হয়, পায়ের যে অংশ কেটে ফেলা হয়েছে সেই অংশই ব্যথা করছে; সেই ব্যথাগুলো উড়ে উড়ে আসছে গায়ে লেগে থাকা পায়ে। দেখিস তো খুঁজে ঝোপে-ঝাড়ে কাটা পা ফেলে গেছে কি না ঐ ডাক্তার। যদি দেখতে পাস তো ঐ ফেলে দেওয়া কাটা পায়েও একটু ব্যথার মলম লাগিয়ে দিয়ে আসিস। যদি ঐ পায়ের দেখা পাস তো খেয়াল করিস সেই পা একা একা হেঁটে বেড়ায় কি না বনজঙ্গলে। ঐ পা তো এখানের সব পথ, বনজঙ্গলের সব পথ চেনে। হয়ত সে একদিন ঠিক ঠিক ফিরে এসে আমার পায়ের সাথে জুড়ে যাবে। পা কি মানুষের পর হতে পারে মা? কেটে ফেলেছি বলেই কি ঐ পা আমার পর হয়ে গেছে? পর হয়নি। অনুরোধ করছি, খুঁজে পেলে ঐ কাটা পায়ে একটু মলম লাগিয়ে আসিস।’
তন্দ্রাচ্ছন্ন বাবার কথা শুনে মাধবী চুপচাপ জল ঝরাতেই থাকে। একদণ্ড শ্রীদামের জিহ্বা বসে থাকে না।
মাধবী কখনো বলে—‘চুপ করো তো বাবা, নিজেকে একটু আরাম দাও।’ শ্রীদাম বলে—‘এই জিহ্বা ঘুমা।’
মাধবী ছলছল চোখে হেসে ওঠে বাবার রসিকতায়।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে শ্রীদাম। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। কথা বলে কোনো লাভ নেই, চুপ করে থাকাতেও কোনো লাভ নেই। অথবা সে ভুলে যায় মাধবীর নিষেধ। অথবা জিবটা নিজেই একটা জীব; নিজেই জেগে ওঠে যেমনভাবে শীতনিদ্রা শেষে জেগে ওঠে সাপ।
গুনগুন করে কথা বলা শুরু করে—‘মা রে, খিদে লাগে না। খিদে লাগে না কেন? মনে হচ্ছে পেটের ভেতর কে যেন পা ঢুকিয়ে রেখেছে। সে পা হজমও হয় না, খিদেও লাগে না, খিদেও যায় না। পেটের ভেতর পা হেঁটে বেড়াচ্ছে যেন। মগজের ভেতর কে যেন পা ঢুকিয়ে রেখেছে, পা ছাড়া কিছু ভাবতে পারছি না। মগজের কাদায় কার পা আটকে গেল? যার পা আটকে গেছে সে পা তুলে নিতে পারছে না নতুন ধাপ ফেলার জন্য। দম আঁটকে আসছে রে মা, আমার ফুসফুসের ভেতর কে পা ঢুকিয়ে রেখেছে? রোগের মুখোশ পরা মরণ পা ঢুকিয়ে রেখেছে? ভগবান পা ঢুকিয়ে রেখেছে আমার মুখে, পেটে? ভগবান আমার বুকের ভেতর, পেটের ভেতর, মাথার ভেতর পা ঢুকিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে? ও ভগবান জেগে ওঠো, আমার ফুসফুসের ভেতর থেকে পা বের করে নাও, আমি শ্বাস নিতে পারছি না। আমার ফুসফুস কি পায়ের জুতো যে জুতোর মতো পরে আছো পায়ে?’
কথা বলতে বলতে শ্রীদাম হাঁপিয়ে ওঠে। সে চুপ করে; দম নেয়। আবার কথা চুয়ে চুয়ে তার বুকে জমা হলে, মুখে জমা হলে হয়ত কথা বলা শুরু করবে। খাল সেচার পর থামলে চারপাশ থেকে জল চুয়ে চুয়ে এসে আবার জলপূর্ণ হয়ে যায় সেই খাল। তেমনই মানুষের বুক। কথা শেষ হলে চুপ করে। চারদিক থেকে চুয়ে চুয়ে কথা এসে হাজির হলে আবার কথা বলা শুরু করে।
[অবনী নির্মম এক হবনী। মানুষই হবনীয়।]
মাধবী ওষুধ নিয়ে আসে। রোগবান শ্রীদাম বিশাল হা করে ওষুধ খায়; মুখবিহ্বরের বিশাল হা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার এক কৃষ্ণগহ্বর যেন; হা-গুহার নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের ভেতর সূর্যের মতো হলুদ ওষুধটা টুপ করে হারিয়ে গেল; মিলিয়ে গেল।
ওষুধ খাবার পর শ্রীদাম বলে—‘মা রে, বেঁচে থাকতে থাকতে বেঁচে থাকা অভ্যেস হয়ে গেছে বলে বেঁচে আছি। ওষুধ খাচ্ছি। বেঁচে থাকতে চাচ্ছি। মরতে চাচ্ছি না। সবই অভ্যাসের বশে মা। মানুষ অভ্যাসে ভাসে, আমিও ভাসছি। বেঁচে থাকায় যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই নাই। অবনী এক নির্মম হবনী আমরাই তাতে আহুতি।’
শ্রীদাম বলে—‘প্রতিদিন মরে মানুষ তবু মানুষের মরণের অভ্যেস গড়ে উঠেনি। মানুষের অভ্যাস গড়ে উঠেছে বেঁচে থাকার। সুখ ফুরালেও বেদনা নিয়ে বাঁচে, দেহ পচেগলে গেলেও গলাপচা দেহ নিয়ে বাঁচে, আলো না থাকলেও অন্ধকার নিয়ে বাঁচে, সুনাম চলে গেলেও দুর্নাম নিয়ে বাঁচে; মরে গেলেও ফারাও সম্রাটরা মমিতে, পিরামিডে বাঁচে; মুসলমানেরা কবরে বাঁচে; হনুমান গন্ধমাদনের শেকড় উপড়ে তুলে আনে, রাম-লক্ষ্মণ ছিঁড়ে নেয় বিশল্যকরণী, মৃতসঞ্জীবনী। মরে গেলেও কবর থেকে বেরিয়ে যিশু; আসমানের ওপরে গিয়ে বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকা এক অদ্ভুত নেশা।’
কথা বলতে বলতে কথার গায়ে ঢলে পড়ে শ্রীদাম। গলে পড়ে শ্রীদাম। দেহ নেই দেহের ছিবড়া পড়ে আছে চাদরের মতো বিছানার চাদরের ওপর। তার দেহচাদরসহ যেন মোট তিনটা চাদর। শ্রীদামের বিছানায় শুয়ে থাকার স্তরটা অনেকটা এমন—বিছানার চাদর তার ওপর দেহচাদর, দেহচাদরের ওপর গায়ে দেবার চাদর।
[রবা বাবা। বোবা বাবা।]
ব্যথা পেয়ে চিৎকার করার জন্যও তো শক্তি লাগে। শ্রীদামের ঐ শক্তিও আর থাকে না দুদিন পরে। ব্যথা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু চিৎকার দিতে পারছে না। নিস্তেজ। ব্যথার বিষতেজ তাকে নিস্তেজ করে রেখেছে। শ্রীদাম ঘুমের ঘোরেও আর কথা বলে না, ওষুধ খেতে চায় না, খাবার খেতে চায় না। ‘মাধবী’ বলে ডাকে না। সারাদেহ মরদেহ শুধু নাক আর হৃদয়টা বেঁচে আছে। মাধবীর বুক ধক করে ওঠে থেকে থেকে।
মাঝে মাঝে বাবার কাছে গিয়ে বলে—‘বাবা, বাবা গো, কথা বলো বাবা, আর মানা করব না কথা বলতে, তুমি কথা বলো, ব্যথা পেয়ে চিৎকার করো; কথা বলাটাই বেঁচে থাকা গো বাবা, ব্যথা পেয়ে চিৎকার করাটাই বেঁচে থাকা গো বাবা।’
তার বাবা বোবা হয়ে শুয়ে থাকে। কখনো ব্যথায় মুখ চোখ কুঁচকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলার চেষ্টা করে, মাধবী তার মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়েও কিছু বুঝতে পারে না। কতকিছু দিয়ে মানুষের সম্পর্ক বাধা। ভাষাও একটা সুতা। ভাষা দিয়ে মানুষে মানুষ বাঁধা। তার বাবার কথা হারিয়ে যাওয়াতে যোগাযোগের সবচে বড়ো সুতাটা ছিঁড়ে গেছে যেন। মাধবী দেখে তার বাবা একেবারে বোবা বনে গেছে, ব্যথায় গোঙানি নেই কিন্তু মাধবী দেখতে পায় তার বাবার নিঃসাড় শরীরে ব্যথার চলাচল; ব্যথার চলাচল সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে যেমনভাবে স্বচ্ছ জলের তলের মাছের চলাচল দেখতে পাওয়া যায়।
দুএকবার কথা বলার চেষ্টা করেও পারে না শ্রীদাম। দম নেই যেন। সে বেশ দমে যায়। ফ্যালফ্যাল করে সাদা চোখে তাকায়। মাধবী তার বাবার দিকে বেদনামাখা নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে; শুকিয়ে একেবারে শরীরের কাঠ বেরিয়ে গেছে। চোখের কোটরে যেন পাখি বসে থাকতে পারবে, ডিম পাড়তে পারবে।
রবা মানুষ যদি বোবা হয়ে যায় তবে তা একটা বড়ো বিপর্যয়। কোনোদিন কথাহীন তার বাবাকে সে দেখেনি; এক মুহূর্ত জিহ্বাকে বসিয়ে রাখতে দেখেনি। এত কথা বলে যে মাধবীর বিরক্ত ধরে যেত। এখন রবা বাবাকে বোবা বাবা হয়ে থাকতে দেখে তারই আর ধৈর্য সহে না। একজন রবামানুষ হঠাৎ করেই বোবামানুষ হয়ে গেল! সে বারবার চাইছে তার বাবা কথা বলে উঠুক; অনর্গল বকবক করতে থাকুক।
শ্রীদাম কথা বলছে না ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার কশ বেয়ে আঠালো কষ পড়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছে।
[মরায়ন]
পুরো একদিন চুপ থেকে শ্রীদাম পরদিন কথা বলে ওঠে খুব ধীরে—‘মাধবী মা, আমার ভেতর যেন একদল লুটেল ডাকাত ঢুকে গেছে, কেউ লুট করে নিচ্ছে ফুসফুস, কেউ হৃৎপিণ্ড, কেউ পেটের নাড়িভুঁড়ি ধরে টানাটানি করছে। লুট হয়ে গেল মা, ভেতরের সব লুটপাট হয়ে গেল।’
তার চোখ দিয়ে অবিরল জল ঝরতে থাকে। মাধবীর চোখ দিয়ে অবিরল জল ঝরতে থাকে।
মাধবী বলে—‘এবার ধকলটা কেটে গেলে সকল ব্যথা চলে যাবে তোমার। ধৈর্য ধরো বাবা।’
মাধবীর স্বান্ত্বনা দেওয়া দেখে শ্রীদাম ঠোঁট একটু ফাঁক করে হাসে—মহারৌরব থেকে মহাসৌরভ আসবে? সে আশাতেই আছি এ শরীররৌরবে—এ দেহরৌরবে রে মা। তুই আমার মা রে মাধবী।’
চুপ করে থেকে দম নেয় শ্রীদাম।
আবার বলে—‘তবু স্বপ্নের ভেতর লুকানোর মতো জায়গা থাকতো আগে, ঘুমানোর মতো জায়গা থাকত; এখন তাও নেই। স্বপ্নের ভেতরেও পিঠের তলায় কাঁটাখোঁচ, পায়ের তলায় কাঁটাখোঁচ, মাথায় কাঁটার পাগড়ি।’
আবার বলে—‘পাথর ফাটিয়ে আতর বের করব। শূন্য ফাটিয়ে পূর্ণ বাহির করব। মাধবী মা...’
আর কথা বলতে পারল না শ্রীদাম। চুপ করল। তার চোখ থেকে জল ঝরছে। যেন জলের ডিম; এ ডিম থেকেই দরিয়া জন্মিবে। যেন আশার বিচি; এ বিচি থেকেই জীবনবর্ধক আয়ু জন্মিবে।
এভাবে পায়ের ব্যথা বিষে পিষ্ট হয়ে শ্রীদাম শ্মশানে চলে গেল কয়েকদিনের মধ্যেই। এক পা গোটা। এক পা অর্ধেক। তবু কী সুন্দর করে সে হেসে হেসে চলে গেল।
মাধবী অভিমানে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকল—‘মানুষ কী এতই অবিবেকী হয়? এভাবে চলে যায়? তাহলে তুমি আর মায়ের চেয়ে কী ভালো হলে বাবা? আমি এখন কী করব?’
অভিমানে কাঁদল না মাধবী। কিন্তু যখন খাটলি শ্মশানবন্ধুদের কাঁধে উঠল আর বোল উঠল—‘বল হরি, হরিবোল’ তখন জোরে একটা কান্নার চিৎকার দিয়ে চিৎ হয়ে পড়ে গেল মাধবী। মূর্ছা গেল। হরিনাম করতে করতে, খোলখত্তাল বাজাতে বাজাতে শ্মশানযাত্রীরা শ্মশানের পথে এগিয়ে গেল; দুএকজন নারী মূর্ছিতা মাধবীর দিকে এগিয়ে গেল।