সিরিয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে কোনও ধরনের সংঘাত তুরস্ক চায় না বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তবে ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলা সিরিয়ার নতুন সরকারের জন্য হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। শুক্রবার (৪ এপ্রিল) ব্রাসেলসে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনের সাইডলাইনে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন ফিদান।
ফিদান বলেন, সিরিয়ায় ইসরায়েলের হামলা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারকে ইসরায়েল টার্গেট করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফিদান বলেন, সিরিয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের কোনও সংঘাত চাই না, কারণ সিরিয়া সিরিয়ানদের। সিরিয়ার নিরাপত্তা নির্ধারণের অধিকার কেবল সিরিয়ানদেরই থাকা উচিত।
২০২৩ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলের হামলার তীব্র সমালোচনা করে আসছে তুরস্ক। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে তারা। আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিসি) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলায় যোগ দিয়েছে তুরস্ক, পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করেছে। ইসরায়েল গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
আঞ্চলিক এই দুই শক্তির মধ্যে বৈরিতা এখন সিরিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে। দামেস্কে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইসরায়েল সিরিয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরে বিমান হামলা চালাচ্ছে। তুরস্ক এসব হামলাকে সিরিয়ার ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল বলেছে, সিরিয়ায় কোনও শত্রুশক্তিকে তারা মেনে নেবে না।
ফিদান বলেন, এই পরিবর্তনের সময়ে সিরিয়ায় আইএস বা পিকেকে'র মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যেন সুযোগ না নিতে পারে, সেদিকে নজর রাখছে তুরস্ক। দুর্ভাগ্যবশত, ইসরায়েল সিরিয়ার সামরিক সক্ষমতাগুলো একে একে ধ্বংস করে দিচ্ছে, যা নতুন আইএস ও অন্যান্য সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলায় নতুন রাষ্ট্র ব্যবহার করতে পারত।
তিনি বলেন, ইসরায়েল সিরিয়ায় যা করছে, তা কেবল সিরিয়ার নিরাপত্তাকেই হুমকিতে ফেলছে না, বরং ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার পথও তৈরি করছে।
তবে দামেস্কের নতুন সরকার যদি ইসরায়েলের সঙ্গে ‘কোনও সমঝোতায়’ পৌঁছাতে চায়, সেটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিরিয়ার নতুন ইসলামি সরকারের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মিত্র হয়ে উঠেছে তুরস্ক। বছরজুড়ে আঙ্কারা বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছে, যারা এখন নতুন সরকারের মূল স্তম্ভ। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তারা লড়াই করেছিল।
সিরিয়ার পুনর্গঠনে সাহায্য করার অঙ্গীকার করেছে তুরস্ক। অবকাঠামো থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে তারা। পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তুরস্ক একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনকে স্বাগত জানিয়েছে।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন ফিদান। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সিরিয়া সংক্রান্ত নীতি এবং সেখানে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা পর্যালোচনা করছে বলে তিনি বুঝতে পেরেছেন।
ফিদান বলেছেন, তারা সিরিয়া সংক্রান্ত ফাইল পর্যালোচনা করছে এবং নিষেধাজ্ঞা নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছে, কারণ এটি একটি ভিন্ন শাসন ও হুমকি মূল্যায়নের জন্য চালু করা হয়েছিল। এখন আমাদের কাছে একটি নতুন সিরিয়া আছে। আমার মনে হয়, এই নতুন সিরিয়ার জন্য একটি ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োজন।
ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার উদ্যোগকে সমর্থন করছে তুরস্ক। তবে গাজা উপত্যকা দখল করে এটিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়ারা’ বানানোর পরিকল্পনার মতো নতুন প্রশাসনের কিছু মধ্যপ্রাচ্য নীতির বিরোধিতা করেছে আঙ্কারা।
ফিদান ট্রাম্পের সমস্যা সমাধানের কৌশলকে দুই ন্যাটো মিত্রের মধ্যে চলমান বিরোধ, বিশেষ করে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার উপায় হিসেবে দেখেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে একটি সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে।
কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে মার্কিন-মধ্যস্থতায় কোনও শান্তি চুক্তি ‘বাস্তবায়ন করা কঠিন’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে আরও মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের চেয়ে এটি ভালো হবে বলে মনে করেন ফিদান। যুদ্ধ যেন আবার শুরু না হয়, তা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক হামলার হুমকি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ফিদান বলেন, বিরোধ সমাধানে কূটনীতির প্রয়োজন এবং তুরস্ক তার প্রতিবেশী ইরানের বিরুদ্ধে কোনও হামলা দেখতে চায় না।