সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বিমান হামলায় বোমা বর্ষণের তীব্রতা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। গাজায় আটকে পড়া বিদেশি পাসপোর্টধারীদের উপত্যকা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে সোমবার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বাসিন্দারা বলছেন, দশম দিনে গড়ানো সংঘাতে রবিবার দিবাগত রাতে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই স্থল অভিযান শুরু করতে পারে ইসরায়েল। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
গাজার বাসিন্দারা বলেছেন, সোমবার দিনভর বোমা বর্ষণ অব্যাহত ছিল। অনেক ভবন গুঁড়িয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন অনেক মানুষ। হামাসের রকেট নিক্ষেপের ঘটনায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ একাধিকবার সতর্কতা জারি করেছে।
বিধ্বস্ত ছিটমহলে ত্রাণ সরবরাহের জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ চলমান রয়েছে। ৭ অক্টোবর হামাস যোদ্ধারা ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর থেকে অবিরাম বোমা বর্ষণের শিকার হচ্ছে গাজা। হামাসের হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। এটি ইসরায়েলের ৭৫ বছরের ইতিহাসে এক দিনে হামলায় সর্বোচ্চ প্রাণহানি।
সাময়িক যুদ্ধবিরতির কথা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হাগারি বলেছেন, গাজায় কোনও যুদ্ধবিরতি চলমান নেই, ইসরায়েল অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
তিনি বলেন, এমন কোনও উদ্যোগ এই মুহূর্তে নেই। যদি কোনও পরিবর্তন ঘটে আমরা জনগণকে জানাবো। আমরা হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রেখেছি।
গাজায় সর্বাত্মক অবরোধ জারি রেখেছে ইসরায়েল। একই সঙ্গে স্থল অভিযান চালিয়ে হামাসকে ধ্বংস করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। ইতোমধ্যে সীমান্তে সেনা ও ট্যাংক মোতায়েন করা হয়েছে। হামাসও ইসরায়েলি ভূখণ্ডে রকেট নিক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, সোমবার দক্ষিণ ইসরায়েলের কয়েকটি শহরে সতর্ক সংকেত বাজানো হয়েছে।
গাজা কর্তৃপক্ষ বলছে, সোমবার সকাল পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ২ হাজার ৭৫০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ শিশু। আহতের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। আরও অন্তত ১ হাজার মানুষ নিখোঁজ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খাদ্য, জ্বালানি ও সুপেয় পানির ঘাটতি থাকায় একাধিক দেশ গাজার জন্য ত্রাণ পাঠিয়েছে। কিন্তু সেগুলো মিসরে আটকে আছে। গাজায় ত্রাণ সরবরাহ এবং বিদেশি পাসপোর্টধারীদের নিরাপদে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সমঝোতা না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এর আগে সোমবার মিসরীয় গোয়েন্দা সূত্র রয়টার্সকে বলেছিল, ছিটমহলে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাফাহ ক্রসিং উন্মুক্ত করতে একটি সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় তা অস্বীকার করে এক বিবৃতিতে বলেছে, গাজায় ত্রাণ সরবরাহের বিনিময়ে বিদেশিদের সরিয়ে আনার কোনও সমঝোতা এই মুহূর্তে নেই।
হামাস কর্মকর্তা ইজ্জাত এল রেশিক রয়টার্সকে বলেছেন, রাফাহ ক্রসিং চালু বা সাময়িক যুদ্ধবিরতির খবরের কোনও সত্যতা নেই।
মিসর বলেছে, ক্রসিংয়ের ফিলিস্তিনি অংশে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের কারণে তা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সোমবার মিসরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী শামেহ শৌকরি বলেছেন, ইসরায়েল সরকার ক্রসিং চালু করার বিষয়ে কোনও অবস্থান জানায়নি।
রয়টার্সের সাংবাদিক জানিয়েছেন, রাফাহ ক্রসিংয়ের ফিলিস্তিনি অংশে অল্প সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছেন। তারা মিসরে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। গাজা থেকে বের হওয়ার যেসব পথ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে কেবল এটিই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে নেই।
যুক্তরাষ্ট্র দেশটির নাগরিকদের ক্রসিংয়ে যাওয়ার জন্য বলেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের ধারণা, গাজায় অবস্থানরত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিকের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০ হবে।
হামাসের হাতে জিম্মি থাকা ১৯৯ জনের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্যও কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। জিম্মিদের মধ্যে বয়স্ক, নারী, শিশু ও মার্কিনিসহ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ছয়টি আরব দেশ সফর করে সোমবার আবার ইসরায়েল পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইসরায়েলে সামরিক সহযোগিতা পাঠিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের ত্রাণ সরবরাহের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। ইসরায়েলকে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, হামাসের হামলার জবাবে আক্রমণে যুদ্ধের আইন মেনে চলার জন্য।
ভারী বোমাবর্ষণ
স্থানীয়রা বলেছেন, সোমবার গাজার উত্তরাঞ্চলে আল-কুদস হাসপালাতের আশেপাশে বোমা বর্ষণ করেছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। হামলায় অনেক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানকার বাসিন্দারা বাধ্য হয়েছেন রেড ক্রিসেন্ট পরিচালিত হাসপাতালে আশ্রয় নিতে। ইসরায়েলের দাবি, হামাস যোদ্ধারা এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে অবস্থান করছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, গাজা শহরে বেসামরিক জরুরি ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার তিনটি কার্যালয়ে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে পাঁচজন নিহত ও উদ্ধার অভিযান অচল হয়ে পড়েছে।
গাজার বাসিন্দাদের দক্ষিণাঞ্চলে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ সেখানে পাড়ি জমিয়েছেন। পুরো উপত্যকায় প্রায় ২৩ লাখ মানুষের বসবাস। হামাস স্থানীয়দের ইসরায়েলি নির্দেশ অমান্য করার আহ্বান জানিয়েছে। গাজার দক্ষিণের বাসিন্দারাও ইসরায়েলি বিমান হামলার আশঙ্কায় রয়েছেন।
দক্ষিণ গাজায় খান ইউনিস শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি হামলায় এক পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। তাদের প্রতিবেশী সুহাইল বাকের (৪৫) বলেছেন, বিস্ফোরণের শব্দে তার ঘুম ভেঙেছে। আতঙ্কের মধ্যে জেগে তাদের ছিন্নভিন্ন অবস্থায় দেখতে পাই। বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তাদের মরদেহ বের করতে অনেক সময় লেগেছে।
পাশের রাস্তায় আবু আহমেদ নামে এক ব্যক্তি নিজের বাড়ির বাইরে বসেছিলেন। তিনি রয়টার্সকে বলেছেন, ইসরায়েল আমাদের সবাইকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
জাতিসংঘের মানবিক কার্যালয় সোমবার সকালে জানিয়েছে, গাজার হাসপাতালগুলোতে যে জ্বালানি অবশিষ্ট আছে তাতে আর মাত্র ২৪ ঘণ্টা চলবে। এতে রোগীরা ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
জাতিসংঘ বলেছে, ইতোমধ্যে গাজার প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা উপত্যকার ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তারা নিজেদের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারছেন না।
টানা পঞ্চম দিনের মতো গাজায় কোনও বিদ্যুৎ নেই। এর ফলে স্বাস্থ্য, পানিও পয়নিষ্কাশনসহ অত্যাবশ্যক সেবা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। কৃষিকাজের জন্য স্থাপিত কূপ থেকে মানুষ লোনা পানি পান করছে। এতে রোগের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।