বাতাসে বারুদের গন্ধ। শিশুদের চিৎকারে ভারী অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার আকাশ-বাতাস। অষ্টম দিনের ইসরায়েলের চলমান বোমা হামলায় এতটুকুও নিরাপত্তা নেই ফিলিস্তিনিদের। গাজার বাসিন্দাদের উত্তর থেকে দক্ষিণে অবিলম্বে সরে যেতে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এরমধ্যে শুরু হয়েছে প্রথম পর্যায়ের স্থল অভিযান। এমন আগ্রাসী পদক্ষেপে চরম অস্তিত্ব সংকটে গাজার ফিলিস্তিনিরা।
নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গাজার ঘনবসতি জায়গা খুঁজে খুঁজে বৃষ্টির মতো বোমা ফেলছে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে ‘সাদা ফসফরাস’ বোমা। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী জনবসতি স্থানে এসব বোমা ফেলা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
অবরুদ্ধ উপত্যাকাটির কোথাও নিরাপদ নয়। বোমার আঘাতে কখনও ভেঙে পড়ছে বাড়ি, কখনও মসজিদ-স্কুল। যে যার মতো দক্ষিণাঞ্চলের দিকে ছুটছে। কিন্তু গুরুতর আহত ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে সতর্ক করেছে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্যমতে, এসব সংকটাপন্ন রোগীদের অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়াটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শুক্রবার (১৩ অক্টোবর) জাতিসংঘকে জানিয়েছে, ওয়াদি গাজার উত্তরে বসবাসকারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ গাজায় স্থানান্তরিত করতে হবে।
জাতিসংঘ বলেছে, উত্তর গাজার ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনির বসবাস। যা সমগ্র গাজা উপত্যকার প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা।
এই নোটিশ দেওয়ার পরই ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, গাজার উপকণ্ঠে পদাতিক ও সাঁজোয়াবাহিনীর সদস্যরা অঞ্চলগুলোতে অভিযান চালিয়েছে। লুকিয়ে থাকা হামাস সদস্য, তাদের অবকাঠামো ও বিভিন্ন সেলগুলো শনাক্ত করতে এই অভিযান।
অবরুদ্ধ গাজাকে দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষা দিয়ে আসছে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস। এই গোষ্ঠীটির জন্য এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি দখলদারিত্ব থেকে টিকে আছে গাজা। তাদের অবাধ সমর্থন দিয়ে আসছে এখানকার ফিলিস্তিনিরা। কিন্তু গত শনিবার থেকে পরিস্থিতি খুবই নাজুক।
বছরের পর বছর ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও আগ্রাসনের প্রতিবাদে গত শনিবার গাজার কাটাতারের বেড়া ভেঙে ইসরায়েলে ঢুকে পড়ে হামাসের কয়েক হাজার যোদ্ধা। ইসরায়েলের গর্বের প্রতীক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের চোখ ও নিরাপত্তা বাহিনী ফাঁকি দিয়ে এভাবে ঢুকে পড়ায় নিজ জনগণের তোপের মুখে নেতানিয়াহুর প্রশাসন।
সমালোচনার মুখে হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এদিকে তার সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল জনাথন কনরিকাস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘হামাসকে ধ্বংস ও তাদের সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া আমাদের লক্ষ্য। এটিই হবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের শেষ পর্যায়।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘এই অভিযানের লক্ষ্য একেবারে স্পষ্ট। যুদ্ধ শেষে হামাস আর কখনও ইসরায়েলের সেনা বা বেসামরিকদের ক্ষতি করতে পারবে না।’
এমন বাস্তবতায় জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বিবৃতিতে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের নতুনভাবে বাস্তুচ্যুত করতে ইসরায়েলের যে কোনও পদক্ষেপ এই অঞ্চলের সংঘাতকে ‘গভীর খাদে’ ঠেলে দেবে। ইসরায়েল গাজায় মানবিক সহায়তা বন্ধ করায় এবং ভূখণ্ডের উত্তরে নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার আদেশ প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
এদিকে ইসরায়েলের সর্বাত্মক অবরোধ চলার কারণে উপায় না পেয়ে গাজার বাসিন্দাদের জন্য চিকিৎসা সহায়তা প্রতিবেশী মিসরে পাঠিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির প্রধান অ্যান্থোনিও গুতেরেস সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেছেন, ‘জরুরি চিকিৎসা সামগ্রীসহ একটি বিমান মিসরীয় শহর আরিশে অবতরণ করেছে। যা গাজার সীমান্ত থেকে প্রায় ২৮ মাইল দূরে।’
তবে বিবদমানপক্ষগুলো মানবিক করিডোরে সম্মতি হওয়া সাপেক্ষে গাজায় সহায়তা প্রবেশে করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। এ নিয়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ সিসির সঙ্গে আলোচনাও করেছেন গুতেরেস।
এদিকে গাজায় বিমান হামলায় হামাসের এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে আইডিএফ। কিন্তু এর সত্যতা স্বীকার করেনি হামাস। গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ৩২৪ ফিলিস্তিনি নিহত হন। আহত হাজারো ফিলিস্তিনি। গত শনিবার থেকে এ পর্যন্ত উপত্যাকায় ২ হাজার ২০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৯ হাজার।
গাজায় নির্বিচারে বোমা বর্ষণের ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ অ্যাখ্যা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসাইন আমির।লেবাননে ইরানের দূতাবাসে সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের দায় বিশ্বকে নিতে হবে। গত এক সপ্তাহে ফিলিস্তিনিদের হত্যা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি ইহুদিরা। রিয়াদ-তেহরান ফিলিস্তিনকে সমর্থন জানাতে একমত হয়েছে। সেই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে হামলায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে সম্মত দুই দেশ।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা