X
রবিবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৫
২৩ চৈত্র ১৪৩১

যেভাবে ঢাকার ‘ঢাকেশ্বরী’ কলকাতায়

রক্তিম দাশ, কলকাতা
১৮ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:৩০আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:৩০

মধ্যরাতে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হলো সাতচল্লিশে। রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় ভিটে-মাটি ছেড়ে রাতের অন্ধকারে নিঃস্ব হয়ে এক কাপড়ে মাতৃভূমি ছেড়ে দলে দলে মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে শুরু করলেন পশ্চিমবঙ্গে। সেদিন শুধু উদ্বাস্তু মানুষরাই নন, দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন মা ঢাকেশ্বরীও। গোপনে তাকে কলকাতায় চলে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছিল উত্তর কলকাতার কুমারটুলিতে।

ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির এখন বাংলাদেশে সরকার দ্বারা ঘোষিত জাতীয় মন্দির। শুধু তাই নয়, এর পরিচিতি সতীপীঠ হিসেবেও। এখানে সতীর মুকুটের মণি পড়েছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত শক্তিপীঠগুলোর মধ্যে এটি একটি। ঢাকেশ্বরী শব্দের অর্থ ‘ঢাকার ঈশ্বরী’ বা ‘ঢাকা শহরের রক্ষাকর্ত্রী’। দেবী ঢাকেশ্বরীর নাম থেকেই ‘ঢাকা’ নামের উৎপত্তি। কিন্তু কী অদ্ভুত ঢাকা শহরের সেই রক্ষাকর্ত্রীকেই একদিন দেশভাগের শিকার হয়ে অগণিত শরণার্থীর মতো পালিয়ে আসতে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে।

কথিত আছে, রাজা আদিসুর তার এক রানীকে বুড়িগঙ্গার পাশে জঙ্গলে নির্বাসন দেন। ওই জঙ্গলে রানি জন্ম দেন বল্লাল সেন কে। শৈশবে জঙ্গলের মধ্যে বল্লাল সেন একটি দেবীমূর্তি পান। পরে তিনি রাজা হলে যেখানে দেবীর মূর্তি পেয়েছিলেন সেখানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মূর্তিটি জঙ্গলে ঢাকা অবস্থায় পেয়েছিলেন বলে দেবীর নাম হয় ‘ঢাকা+ঈশ্বরী’ বা ‘ঢাকেশ্বরী’। মন্দিরটিও ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির’ নামে পরিচিতি পায়। রাজা মানসিংহ ১৫৯৪-১৬০৬ সাল পর্যন্ত বাংলার সুবেদার থাকাকালীন মন্দিরটির জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে এটির সংস্কারের ব্যবস্থা করেন। এ  সময় তিনি মন্দির প্রাঙ্গণে ৪টি শিবলিঙ্গ স্থাপন করেন ও তার পাশাপাশি চারটি শিবমন্দিরও নির্মাণ করেন। দেবী ঢাকেশ্বরীর আসল বিগ্রহটি ৮০০ বছরের পুরোনো। দেবী বিগ্রহের উচ্চতা দেড় ফুট। দেবীর দশ হাত। মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা রূপেই তিনি অবস্থান করছেন। পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী ও নিচে কার্তিক ও গণেশ। বাহন রূপে পশুরাজ সিংহের ওপর দাঁড়িয়ে দেবী মহিষাসুরকে বধ করেছেন। রাজা মানসিংহ আজমগড়ের এক তিওয়ারি পরিবারকে এর সেবায়েত নিযুক্ত করেছিলেন।

১৯৪৭-এর আগস্ট মাসে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত। আর স্বাধীনতা প্রাপ্তির সঙ্গেই দুই ভাগ হওয়া প্রদেশ পাঞ্জাব ও  বাংলার দুই প্রান্তই ভরে উঠতে লাগলো উদ্বাস্তুদের ভিড়ে। রাতারাতি ভিটেমাটি উজাড় হয়ে গেছে, কেউ আবার পরিবারকেই খুঁজে পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতির মুখে পড়ল ঢাকেশ্বরী মন্দিরও। দেশভাগ-পরবর্তী দাঙ্গার সময় আক্রমণ এবং লুণ্ঠনের হাত থেকে দেবীকে রক্ষা করতে চাইলেন হিন্দুরা। যতই ঢাকার ঐতিহ্য হোক না কেন, এমন উত্তপ্ত সময় বিগ্রহকে রক্ষা করতে হবে। তৎপর হয়ে উঠলেন সেখানকার সেবাইতরা। ঠিক হলো, ঢাকেশ্বরী মাতার জন্যই একটি বিশেষ উড়োজাহাজের আয়োজন করা হবে। গন্তব্য কলকাতা। অত্যন্ত গোপনেই শুরু হলো আয়োজন। মূল বিগ্রহটিকে গোপনে এবং দ্রুততার সঙ্গে ১৯৪৮ সালে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন রাজেন্দ্রকিশোর তিওয়ারি এবং হরিহর চক্রবর্তী। ঢাকা থেকে একটি বিশেষ উড়োজাহাজে লুকিয়ে ঢাকেশ্বরী আসল বিগ্রহটি কলকাতায় নিয়ে আসা হয়।

ঢাকায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাপূজা

কলকাতায় বিগ্রহটি আনার পর প্রথম দুবছর হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিটের দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরির বাড়িতে দেবী পূজিতা হন। পরে ১৯৫০ নাগাদ ব্যবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী কুমারটুলি অঞ্চলে দেবীর মন্দির নির্মাণ করে দেন ও প্রতিষ্ঠা করে দেবীর নিত্য সেবার জন্য কিছু দেবোত্তর সম্পত্তি দান করেন। ১৯৫০ সালের ২৬ মার্চ কলকাতায় দেবীর পুনরায় প্রতিষ্ঠার পর সেখানেই পুজো হয়ে আসছে। দেবীকে যেভাবে ঢাকা থেকে অলংকারহীন এবং প্রায় আভরণহীন অবস্থায় আনা হয়েছিল তার ছবিও ওই মন্দিরে রয়েছে। ঢাকার তিওয়ারি পরিবারের বংশধরেরাই কলকাতায় পালিয়ে এসে পুনরায় সেবায়েত নিযুক্ত হন, এখনও তারাই দেবীর নিত্য সেবা করেন। এই দুর্গামন্দিরে নবরাত্রি পালিত হয়। বাঙালি মতে সপ্তমী থেকে দশমী পুজো হয়। এই পুজোর যাবতীয় আয়োজন হয় বৃহনান্দীকরণ দুর্গাপুজো পদ্ধি অনুযায়ী। সপ্তমিতে দেওয়া হয় পঞ্চব্যঞ্জন ও চাটনি। অষ্টমীতে দেওয়া হয় পোলাও, খিচুড়ি, সবজি, পায়েস ও চাটনি। মহানবমীতে দেওয়া হয় পোলাও ও পুরী। শারদীয়ার শুক্লা প্রতিপদে এখানে অখণ্ড প্রদীপ জ্বালানো হয়। দেবীর তিনটি ঘট বা কলস স্থাপিত হয়। ঘটের ওপর ডাব ও গামছার বদলে প্রদীপ স্থাপন করা হয়। ঘটের গায়ে মাটি দিয়ে মঙ্গল চিহ্নের আকারে যব লাগানো হয়। প্রতিবছর মহাষ্ঠমীতে ভক্তদের খিচুড়ি প্রসাদ দেওয়া হয়। এক সময়ে ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মতো এখানেও বলির প্রথা ছিল কিন্তু এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। সন্ধি পুজোর সময় শুধু  চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয় এখানে।

ইতিহাসবিদ ও কলকাতার মওলানা আজাদ কলেজের অধ্যাপক অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মধ্যযুগের এরকম কয়েক শ’ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আধুনিক যুগেও এরকম উদাহরণ আছে। ঢাকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী ঢাকেশ্বরী মাতার প্রকৃত বিগ্রহটিকে ভয়ে এবং দাঙ্গার থেকে বাঁচাতেই ১৯৪৮ এ কলকাতায় নিয়ে আসতে হয়। এখনও ঢাকেশ্বরী মাতার প্রাচীন বিগ্রহটি কলকাতাতেই পূজিতা হন।

লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে দেবী ঢাকেশ্বরীও উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন কলকাতায়। এত বছরের পীঠস্থান থেকে সরে আসতে হয়েছিল তাকে। কলকাতা থেকে ৩০৫ কিলোমিটার দূরে ঢাকার বুকে এখনও দাঁড়িয়ে আছে আদি মন্দিরটি। সেখানে ঢাকেশ্বরী মাতার মতো একই রকমের অন্য একটি বিগ্রহ রেখে পুজো করা হচ্ছে। আর ৮০০ বছরের প্রাচীন সেই মূর্তি রয়েছে  কলকাতার কুমারটুলি অঞ্চলের দুর্গাচরণ স্ট্রিটে। উত্তর কলকাতার শোভাবাজার ছাড়িয়ে কুমোরটুলির এক অপরিসর গলিতে দেশভাগের রক্তাক্ত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে নীরবে নিভৃতে বিরাজমান রয়েছে মন্দিরটি। যে মন্দির পূজিত হচ্ছেন উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে চলে আসা দেবী ঢাকেশ্বরী।

তথ্যসূত্র- ১) ‘কলকাতা কড়চা’, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২) ‘অনাদৃত রত্ন ৪৭: ঢাকেশ্বরী মাতা মন্দির, কুমারটুলি’, আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়, কৌলাল

 

/এএ/
সম্পর্কিত
চুক্তির শর্ত মানছে না ইউক্রেন, জ্বালানি অবকাঠামোতে চালিয়ে যাচ্ছে হামলা: রাশিয়া
নতুন শুল্ক নীতি ইস্যুতে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন নেতানিয়াহু
চীনে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ফিলিপিনো নাগরিক আটক, ম্যানিলার উদ্বেগ
সর্বশেষ খবর
শীর্ষ সন্ত্রাসী নুর হোসেন গ্রেফতার
শীর্ষ সন্ত্রাসী নুর হোসেন গ্রেফতার
সাফল্য এলেও ‘আধা নিবিড়’ চিংড়ি চাষে আগ্রহ কম
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসাফল্য এলেও ‘আধা নিবিড়’ চিংড়ি চাষে আগ্রহ কম
টিভিতে আজকের খেলা (৬ এপ্রিল, ২০২৫)
টিভিতে আজকের খেলা (৬ এপ্রিল, ২০২৫)
রিয়ালের হারের সুযোগ নিতে পারেনি বার্সা
রিয়ালের হারের সুযোগ নিতে পারেনি বার্সা
সর্বাধিক পঠিত
‘জংলি’ দেখে যা বললেন ‘প্রিয়তমা’ নির্মাতা
‘জংলি’ দেখে যা বললেন ‘প্রিয়তমা’ নির্মাতা
চীনের পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে খুশি নন ট্রাম্প
চীনের পাল্টা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে খুশি নন ট্রাম্প
যে কারণে সুনাম হারাচ্ছে গ্রিন-ক্লিন-হেলদি সিটি রাজশাহী
যে কারণে সুনাম হারাচ্ছে গ্রিন-ক্লিন-হেলদি সিটি রাজশাহী
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কালবৈশাখী
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কালবৈশাখী
রফতানিতে সংকট নয়, সম্ভাবনা হিসেবেই দেখছে সরকার
রফতানিতে সংকট নয়, সম্ভাবনা হিসেবেই দেখছে সরকার