মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন ইউক্রেনীয়রা। তাদের আশঙ্কা, কিয়েভের চাওয়াকে উপেক্ষা করে ওয়াশিংটনের উদ্যোগে মস্কো শান্তিচুক্তি করলে, তা ইউক্রেনীয়দের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এ রবিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ খবর জানা গেছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউক্রেনিয়ান প্রিজমের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ইউলিয়া কাজদোবিনা বলেছেন, পুতিন শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। রাশিয়ার সঙ্গে তাদের আগেও একাধিকবার সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু তারা হচ্ছে দু-মুখো সাপের মতো, যারা মুখে মিষ্টি কথা বললেও যখনই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কোনও ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন হয়, তারা চুল পরিমাণও ছাড় দেয় না।
ইউক্রেনের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে রাশিয়ার। ১৯৯৪ সালে ইউক্রেন নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করতে সম্মত হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার দিক থেকে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় যে, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রাখা হবে। অবশ্য এই সম্মান বজায় থাকে কেবল দুই দশক।
২০১৫ সালে গায়ের জোরে ক্রিমিয়া দখল করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে মস্কো। এর সাত বছর পর আবার ইউক্রেনে পূর্ণ সামরিক আগ্রাসন শুরু করে, যা প্রায় তিন বছর ধরে চলছে।
রুশ আগ্রাসনে দখল হারানো ভূখণ্ডকে সবসময়ই 'অস্থায়ীভাবে অধিকৃত অঞ্চল' বলে অভিহিত করে এসেছে ইউক্রেন। কোনও একদিন ওইসব অঞ্চলের অধিকার ফিরে পাওয়া আশা ছিল ইউক্রেনীয়দের মধ্যে। তবে অন্য মিত্রদের না জানিয়েই সম্প্রতি পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন ট্রাম্প। দেড় ঘণ্টার ওই বৈঠক শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, সমঝোতার জন্য পুতিনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছেন তিনি। তবে ইউক্রেনীয়রা তাদের হারানো ভূমি ফিরে পাবে বলে তিনি মনে করেন না।
এই বক্তব্যে ইউক্রেনজুড়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অধিকৃত অঞ্চলে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা করছেন তারা।
রুশ অধিকৃত অঞ্চলে নির্যাতনের শিকার হওয়া নাগরিকদের একজন ইরিনা দানিলোভিচ। ২০২২ সালের এপ্রিলে তিনি হঠাৎ নিখোঁজ হন। প্রায় দুসপ্তাহ পরে রুশ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে, তিনি রুশ সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। তাকে পরবর্তী সময়ে অবৈধ বিস্ফোরক দ্রব্য রাখার দায়ে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। আদালতে দানিলোভিচ অভিযোগ করেছেন, আটক থাকাকালীন তার ওপর ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে।
সিএনএন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, রুশ সেনাবাহিনীর হাতে অধিকৃত অঞ্চলে দানিলোভিচের মতো হাজারো মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং হচ্ছেন।
এদিকে, ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাখান করে জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের সম্পৃক্ততা ছাড়া রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত কোনও শান্তিচুক্তি মেনে নেওয়া হবে না। দেশের সাধারণ নাগরিকের মধ্যেও তার অবস্থানের সপক্ষে জোরালো সমর্থন রয়েছে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ অঞ্চল রাশিয়ার দখলে রয়েছে। মস্কোর হাতে এই বিশাল ভূখণ্ডের অধিকার ছেড়ে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকবে বলে মনে করেন ৬৬তম মেকানিক্যাল ব্রিগেডের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ভলোদিমির স্যাবলিন। তিনি বলেছেন, রাশিয়া যে কোনও দেশে হামলা চালিয়ে তার দখল নিতে পারে আর পরে মাফ চাইলেই চলে- এমন একটি ভয়াবহ নজির তৈরি হবে। এভাবে বৈধতা পেতে থাকলে আশেপাশের অন্যান্য ছোট দেশের দিকেও ক্রেমলিনের নজর পড়তে পারে।
বিভিন্ন সময়ে নিজের লক্ষ্যের কথা প্রকাশ করতে কোনও রাখঢাক করেননি রুশ প্রেসিডেন্ট- ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ডোনেস্ক ও লুহানস্কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চান তিনি। তাই ইউক্রেনীয়দের শঙ্কা, প্রথমে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের কোনও একটা অজুহাত খুঁজে বের করে ঠিকই আগ্রাসন চালিয়ে যাবেন তিনি।
স্যাবলিন বলেছেন, ইউক্রেনের আবারও হামলা চালিয়ে আরও ভূমির দখল নেওয়া থেকে পুতিনকে কেউ থামাতে পারবে না। ইউরোপ ও আমেরিকার সহায়তা না পেলে এখন যতই শান্তি চুক্তি করা হোক, কয়েক বছর পরই আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।