প্রেক্ষাগৃহে ঈদের সিনেমা চলছে রমরমিয়ে। দর্শক পছন্দের সিনেমা দেখতে এসে টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন কিংবা অন্যটি দেখে বাড়ি ফিরছেন। এ কারণে মন খারাপ হচ্ছে অনেকের। তবে এটা বাংলা সিনেমার জন্য আশীর্বাদের মতোই। অভিজ্ঞদের মত, দর্শক যতো প্রেক্ষাগৃহে বাড়ছে, বাংলা সিনেমার সুদিন ফিরছে ততোই।
এবার ঈদের সিনেমা নিয়ে বেশ ইতিবাচক রিভিউ পাওয়া যাচ্ছে, যা আশা জাগাচ্ছে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে। এই যেমন শাকিব খান অভিনীত ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার নির্মাতা হিমেল আশরাফ ‘জংলি’ সিনেমা দেখে শনিবার (৫ এপ্রিল) নিজের দীর্ঘ অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যেমনটা তিনি ‘বরবাদ’ ও ‘দাগি’ নিয়েও করেছেন। যেমন গঠনমূলক সমালোচনা সচরাচর ইন্ডাস্ট্রিতে সচরাচর মেলে না।
‘জংলি’ দেখে নিজের ফেসবুক পেজে এই নির্মাতা লিখেছেন, “ঈদের পরের দিন থেকে ‘জংলি’ দেখার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু টিকিট পাচ্ছিলাম না। গতকাল (৪ এপ্রিল) দেখার আগে ভাবছিলাম এটা নিয়ে একটু কম পজিটিভ রিভিউ দিতে হবে, নইলে মানুষ বলবে যাই দেখি সবই ভালো লাগে আমার। কিন্তু দেখার পর মনে হলো, ‘জংলি’ নিয়ে পজিটিভ না লিখলে সেটা ‘জংলি’ সিনেমার সাথে অন্যায় করা হবে।” এরপর ‘রাজকুমার’ নির্মাতা লিখেছেন, “বরবাদ’ বা ‘দাগি’ থেকে আলাদা ধরনের সিনেমা ‘জংলি’। টিজার বা পোস্টার দেখে যেরকম ভেবেছিলাম, সেরকম নয়। গল্পনির্ভর, সম্পর্কনির্ভর, গতানুগতিক ধারার বাইরের সিনেমা। আমার সবসময় মনেহয়, বাংলাদেশে মহিলা বা পারিবারিক দর্শককে খুশি করতে পারলে সিনেমা সফল হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ‘জংলি’র টার্গেট অডিয়েন্স এরাই।”
সুপারহিট ‘প্রিয়তমা’ স্রষ্টা ‘জংলি’ নির্মাতা এম রাহিম প্রসঙ্গে লিখেছেন, “এই পরিচালকের একটা সিনেমা আমি দেখেছিলাম, ‘শান’। আমার তখন মনে হয়েছিলো এম রাহিম বাজেট পেলে বাংলা সিনেমার কমার্শিয়াল ম্যাস অডিয়েন্সের সফল পরিচালক হতে পারবেন। ‘জংলি’তেও সে সফল। তার যে দিকটা আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে, তা হচ্ছে তার নিজেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা। আমার বা অনেক পরিচালকের মতো তিনি ঘনঘন অন স্ক্রিনে আসেন না, বেশি কথা বলেন না, কাজে বিশ্বাস করেন এবং তিনি জানেন আসলে কী করতে চান। তাকে আমাদের সময়ের অন্যতম মেধাবী নির্মাতা মনে হয় আমার। আমি সত্যি চাই এম রাহিম অনেক বড় বাজেটের কোনও পিওর অ্যাকশন সিনেমা করুক।” অভিনেতাদের প্রশংসা করে এই নির্মাতা এরপর লিখেছেন, “দীঘির অভিনয় ভালো ছিল। সুন্দর লেগেছে ওকে। যদিও ওর চরিত্রের জায়গা কম ছিল। এই মেয়েটার পরিচিতি ও যোগ্যতার তুলনায় ভালো চরিত্রের সিনেমা কম। সামনে আশা করি নিজেকে সম্পূর্ণ প্রমাণ করার মতো কোনও চরিত্র করবেন। বুবলীও বরাবরের মতো অনেক ভালো অভিনয় করেছেন। তার কাজের প্রতি ডেডিকেশন চোখে পড়ার মতো। আমার মতে ‘পোড়ামন ২’-এর পর অভিনেতা হিসেবে এইটা সিয়ামের সেরা কাজ। চকলেট বয় বা তরুণ অভিনেতার খোলস ভেঙে এই প্রথম তাকে আমার পরিপূর্ণ অভিনেতা মনে হয়েছে। প্রতিটা শর্টে যে সিয়াম তার সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছেন সেটা দেখা যায়। ছেলেটা একটা ভালো চরিত্রের জন্য ক্ষুধার্ত ছিল মনে হয়েছে আমার। জান-প্রাণ দিয়ে অভিনয় করেছে। এই সময়ের যে ক’জন অভিনেতা ভবিষ্যতে আমাদের সিনেমার হাল ধরতে পারেন, তার মধ্যে সিয়াম অন্যতম। পিচ্চি মেয়েটার অভিনয় ছিল জংলি সিনেমার অক্সিজেন। সিনেমার মধ্যাংশে চিত্রনাট্য যখন একটু স্লো যাচ্ছিলো, তখন এই ছোট্ট বাচ্চার অভিনয় সিনেমা টেনে নিয়ে যায়।”
‘জংলি’ সিনেয়ার গান প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “যার কথা না বললেই না, তিনি প্রিন্স মাহমুদ। আমাদের নব্বইয়ের বাচ্চাদের কাছে প্রিন্স মাহমুদ কোনও মিউজিশিয়ান না, ম্যাজিশিয়ান। আমার সিনেমায় তাকে গান করাতে রাজি করতে পেরেছিলাম সেটা ছিল আমার জন্য ভাগ্যের ব্যপার। ‘জংলি’ সিনেমার সব গান তার করা। প্রত্যেকটা গানই সুন্দর এবং সিনেমাটিকে অনেক বেশি সিনেম্যাটিক করেছে প্রিন্স মাহমুদের গানগুলো। হ্যাটস অফ প্রিন্স ভাই।”
নির্মাতা এরপর লিখেছেন, “জংলি’র প্রযোজনা টিমে আছেন তরুণ কিছু মানুষ। এদের হাত ধরে বাংলা সিনেমা এগিয়ে যাবে। এই ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল কাজ তাদের দ্বারাই সম্ভব।” শেষে হিমেল আশরফ লিখেছেন, ‘এই ঈদটা বাংলা সিনেমার জন্য একটা নতুন যাত্রার সূচনা। ভালো সিনেমার এই প্রতিযোগিতা চলতে থাকুক। সব ধরনের সিনেমা হোক, সব ধরনের দর্শক মাথায় রেখে সিনেমা হোক। বাংলা সিনেমা তার সবচেয়ে ক্রান্তিকাল পার করছে। এখন বিভেদের সময় না, আলাদা করার সময় না, সবাই মিলে আগানোর সময়! আমাদের আসলে এখন সবই আছে। নাই শুধু সিনেমা হল! কোনও বড় ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান যদি আর মাত্র ১০০ সিনেপ্লেক্স বানাতো, তবে আমাদের সিনেমা বলিউডকে চ্যালেঞ্জ করতে পারত! আমি জানি অনেকে হাসছেন কিন্তু আই মিন ইট!’
বলা দরকার, ‘জংলি’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন সিয়াম আহমেদ, শবনম বুবলী, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি প্রমুখ।
উল্লেখ্য, হিমেল আশরাফ নির্মিত, শাকিব খান অভিনীত ‘প্রিয়তমা’ সিনেমা মুক্তি পায় ২০২৩ সালে। এখানে শাকিবের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন কলকাতার ইধিকা পাল। এরপর ২০২৪ সালে শাকিব-হিমেল জুটি একই সফলতা দেখান ‘রাজকুমার’ সিনেমাতেও।