রাজনীতি আর গীতিকবিতা; শহীদুল্লাহ ফরায়জীর জীবনে দুটোই যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো লেগে আছে। ৬৬ বছরের জীবনে তিনি নানা বাঁকে যা-ই করেছেন বা ভেবেছেন, তার প্রায় সবটুকুই লালনকে সামনে রেখে মানবতার গান গাওয়ার মতো। তাকে বলা হয় দেশের প্রধানতম অন্তর্ভেদী গীতিকবি। প্রেমের আবরণে আত্মিক আর আধ্যাত্মিক গীতিরচনায় তিনি অতুলনীয়। তিনি বলেছেনও, গান রচনায় আমি কারও ভক্ত বা অনুসারী নই, তবে লালনের প্রভাব আমার ভেতরে কাজ করে। গীতিকবির রাজনৈতিক ও কাব্যিক জীবন নিয়ে দীর্ঘ আলাপে উঠে এসেছে চারটি মৃত্যুর ঘটনা। যা কবির মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং জীবনকে গীতিকবিতার পথে টেনে নিতে অথবা গভীরে যেতে সাহায্য করেছে। কেমন করে, গীতিকবির জন্মদিনে (১৭ জুলাই) সেটি জানা যাবে দীর্ঘ এই আলাপে...
মৃত্যু—এক.
নরম স্বভাব আর মিষ্টভাষী গানের মানুষ শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে যেভাবে সবাই চেনেন, তার বিপরীতে উত্তাল একটা জীবন চেপে রেখেছেন তিনি। যে জীবনের পুরোটাতেই রয়েছে রাজনীতি। ১৯৭৩ সাল থেকে যে যাত্রাটা শুরু। তখন তিনি ময়মনসিংহ ফুলপুর উপজেলা তারাকান্দি ইউনিয়নের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। রাজনীতির হাতেখড়ি তখনই। মানুষের কল্যাণ আর সমাজ বদলের ঘোর নিয়ে যুক্ত হন সদ্য গঠিত রাজনৈতিক দল জাসদ-এ। তখন থেকে এখনও, জড়িয়ে আছেন একই দলের হয়ে। নেতাগিরি নয়, অনেকটা অন্তরালে থেকেই কাজ করে চলেছেন দলের জন্য, দেশের জন্য কিংবা মানুষের জন্য।
রাজনীতির এই শহীদুল্লাহ ফরায়জী গানের সঙ্গে যুক্ত হলেন কবে, কীভাবে, সেই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে অনেকটাই স্মৃতিকাতর ৬৬ বছরের এই তরুণ। ধরেই গানের প্রসঙ্গ তুলে ধরতে পারলেন না। ফিরে গেলেন ৭০ দশকের শুরুতে তারাকান্দি গ্রামে। যেখানে বাবাহীন সংসারে মায়ের হাত ধরে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে তার বেড়ে ওঠা।
ফরায়জীর ভাষায়, ‘বাবা ছিল না আমার। বিষণ্ণ একটা শৈশব ছিল আমাদের। বাবাকে আমি দেখিনি। খুব ছোটবেলায় মারা গেছেন। তাকে নিয়ে আমার মগজে কোনও স্মৃতিও নেই। ফলে ছোটবেলা থেকেই নিজে কিছু করার বা উঠে দাঁড়ানোর বা সমাজ বদলানোর একটা আগ্রহ ভেতরে কাজ করছিল। বিশেষ করে যখন এইট নাইনে পড়ি তখন মনে হলো, সমাজ পরিবর্তন, অন্যায়ের প্রতিবাদ, সুষম বণ্টন, এগুলোতে ভূমিকা রাখা দরকার। তখনই বুঝলাম এগুলো করতে হলে রাজনীতি ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই।’
শৈশবের পথ ধরে আগাতে থাকেন কবি, ‘ময়মনসিংহ ফুলপুর উপজেলার তারাকান্দি ইউনিয়ন। যেখানে আমার জন্ম। ১৯৭৩ সালের দিকে, আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। তখনই মূলত রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি সমাজ বদলানোর আশায়। তখন মনে হতো, সমাজের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা কোনও বিষয়ই না। তখন বারবার মনে হতো, মানুষের জন্য কাজ না করলে সে জীবনের কোনও মানে হয় না। অর্থপূর্ণ একটা জীবনের মালিক হতে চেয়েছি সেই ছোটবেলা থেকেই।’
কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বা মুসলিম লীগ বা বাম দলের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে জাসদ-এ যুক্ত হলেন কেমন করে শিশু ফরায়জী? মিলেছে স্পষ্ট জবাব, ‘‘প্রথমত তখন তো আসলে অতো কিছু বিবেচনা করে রাজনীতি করিনি। তাছাড়া তখনও আওয়ামীবিরোধী একটা পরিস্থিতি চলছিল, অভাব-অনটন, বাকশাল ইত্যাদি বিষয়ে। তখন আমার আপন বড় ভাই আমানুল্লাহ ফরায়জীও রাজনীতি করতেন। ল’ কলেজে পড়তো আর ন্যাপ (মোজাফফর)-এর রাজনীতি করতো। আমি তো ভাইয়ের সূত্র ধরে ন্যাপও করিনি। আমি চেয়েছি নতুন কোনও রাজনৈতিক দল বা উত্থান। তখনই জন্ম নেয় জাসদ। ৭২ সালের ৩১ অক্টোবর আমার ভাই বাড়ি এসে বললো, নতুন দল হইছে জাসদ। উনি বাজার থেকে রেডিওতে খবর শুনে আসছেন, ‘আজ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর আত্মপ্রকাশ ঘটলো। মেজর জলিল সভাপতি আর অ স ম আব্দুর রব সাধারণ সম্পাদক।’ আমি তখন ছোট হলেও রাজনীতির খোঁজখবর রাখছিলাম। মেজর জলিল ছিলেন সেক্টর কমান্ডার। অ স ম রব ডাকসুর ভিপি। দুজনের নাম শুনেই মনে হলো, আমি তো এই দলই করবো।’’
থামলেন না। বলতে থাকলেন অনর্গল, ‘এর মধ্যে আমার ভাইও ন্যাপ ছেড়ে জাসদের রাজনীতি শুরু করলো। ৭৩-এর নির্বাচনের সময় মেজর জলিল আমাদের এলাকায় জনসভা করতে এলেন। আমার ভাই হলো জাসদের তারাকান্দি ইউনিয়নের সভাপতি, আর আমি তখন অন্যতম বক্তা! ক্লাস নাইনে উঠলাম তখন। আমার পা কাঁপছিল...। ওই মঞ্চ থেকেই আমার আনুষ্ঠানিক রাজনীতি শুরু। ১৯৭৩ সালের শুরুর দিকের কথা বলছি।’
একই সময়ে শহীদুল্লাহ ফরায়জী শুরু করেন গান লেখাও। কারণ, রেডিও থেকে শুনেছেন নতুন গীতিকার অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা। এর জন্য লাগবে ২৫টি গান। আগ্রহী হলেন নবম শ্রেণির শহীদুল্লাহ। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি গান ও দেশপ্রেমের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। তখন তার মনে হতো, যুদ্ধে না যেতে পারলেও গান দিয়ে বিপ্লব করা সম্ভব।
ফরায়জীর ভাষায়, ‘১৯৭১ সালে রেডিওতে গান শুনতাম। দেশ গড়ার গান। উদ্দীপনার গান। বিপ্লবের গান। খুব নাড়া দিতো গানগুলো। ক্লাস সিক্সে পড়ি সম্ভবত। আমাদের পাড়ায় একটাই রেডিও ছিল। সবাই গোল হয়ে বসে সেটি শুনতাম। গানটা মগজে ঢোকে তখনই। তখন তো যুদ্ধে যাওয়ার বয়স হয়নি। তবে মানসিকভাবে আমি খুব চাইতাম রোজই যুদ্ধে চলে যাই। কিন্তু মায়ের ভয়ে আর যেতে পারিনি। এরপর যুদ্ধ শেষে মনের ভেতর আস্তে আস্তে রাজনীতি ঢোকে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে। সঙ্গে মনে হয় গানটাও লেখার চেষ্টা করি না। গানও তো আমাদের উজ্জীবিত করে। লেখা শুরু করলাম। কিন্তু কি লিখতাম সেটাও জানি না। কারণ, গান বা কবিতা কীভাবে লিখতে হয়, কিছুই তো জানতাম না। লিখতাম আরকি। অনেকে আবার টের পেয়ে মজাও করতো কবি বলে। এর সঙ্গে তো রাজনীতি নিয়েও ব্যস্ত হয়ে গেলাম তখন। এর মধ্যে ৭৩ সালের দিকেই একদিন রেডিওতে ঘোষণা হলো, গীতিকার হতে চাইলে ২৫টি গান লিখে পাঠানোর জন্য।’
পাঠিয়ে দিলেন তারাকান্দি থেকে বাংলাদেশ বেতারের ঠিকানায় নিজের লেখা ২৫টি গান।
এরপর তুমুল বেগে চলতে থাকলো শহীদুল্লাহ ফরায়জীর জাসদের রাজনীতি। ক্লাস নাইন থেকে এসএসসি পাস করে মাত্র কলেজে উঠলেন। তখনই ঘটলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড। আওয়ামীবিরোধী তুমুল রাজনীতি করেও কলেজ ছাত্র শহীদুল্লাহ ফরায়জীর জীবনে প্রথম বাঁক নিয়ে আসে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ঘটনাটি।
ফরায়জী দিনটিকে বর্ণনা করেন এভাবে, ‘‘ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ি। বোনের বাসায় থাকি তখন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন বাসায় ভগ্নিপতি এসে আমাকে বললেন, ‘শেখ মুজিবকে তো খুন করে ফেলছে।’ তখন আমি আওয়ামী লীগের তুমুল বিরোধিতা করা একজন কলেজ ছাত্র। কারণ, তখন ছাত্র রাজনীতি করাই নিষিদ্ধ ছিল। বাকশাল হলো। যেটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। কিন্তু সব বাদ দিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুকে খুনের কথা শুনলাম, সেটা আর মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, যত অপছন্দের মানুষই হোক, তাকে মেরে ফেলবে? এটা কেমন কথা!’’
এরপর দৌড়ে রেডিও শুনতে বেরিয়ে গেলেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী। কারণ, ‘‘বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার। ময়মনসিংহ শহরে গিয়ে রেডিও শুনলাম। সত্যিই মেরে ফেলা হয়েছে। মার্শাল ল’ জারি হয়েছে। রেডিওতে বলছে, ‘মেজর ডালিম বলছি...।’ স্পষ্ট মনে আছে কণ্ঠটি। শহর থেকে আমাদের বাড়ি তিন চার কিলোমিটার দূরে ছিল। ভাবলাম বাড়ি চলে যাই। তখন এলাকার (তারাকান্দি) একটা ক্লাবের সেক্রেটারি আমি। সেদিন আবার খেলা ছিল একটা। ফুটবল ম্যাচ। ১৫ আগস্ট বিকালে। প্লেয়াররাও চলে এসেছে। তো আমি সবাইকে বললাম, ‘আজকে এমন একটা ঘটনা ঘটলো। বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলছে। খেলা তো একটা উৎসবই। আজকে খেলাটা বন্ধ রাখো না।’ কথাটা বলেও যেন অপরাধ করলাম। যে প্লেয়াররা আওয়ামী লীগ করতো, তারাই আমার বিরোধিতা করলো। আমার মুখের ওপর বললো, ‘উনি খুন হইলে আমরা খেলা বন্ধ করুম ক্যা?’ অথচ দলের প্লেয়াররা সবাই ছিল আওয়ামী লীগার। আমি একাই জাসদ। ওরা শুনলো না। সেদিন ম্যাচ হলো। ক্লাবের সেক্রেটারি হয়েও তাদের আটকাতে পারলাম না। এই কষ্টটা এখনও আমার মনে আঘাত করে। বাবার মৃত্যু তো দেখিনি। মৃত্যু কেমন সেটা আসলে তখনও ফিল করিনি। এই প্রথম কারও মৃত্যু আমাকে মানসিক যন্ত্রণায় ফেললো। বারবার আমার মনে হতে লাগলো, এত বড় একজন মানুষকে খুন করলো আর আমি আমার ক্লাবের একটা খেলা বন্ধ রাখতে পারলাম না?’’
ফরায়জীর গানভক্তরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই ধৈর্যহারা হয়ে উঠেছেন। কারণ, রাজনীতির এই গল্প সবার ভালো না-ও লাগতে পারে। তাছাড়া ৭৩ সালে বেতারে পাঠানো ২৫ গানের কী হলো, সেটাও তো জানা জরুরি। এর মধ্যে ৭৫ সালও চলে এলো!
বললেন কবি, ‘বেতারে ২৫ গানসহ চিঠি পাঠানোর পরদিন থেকে স্থানীয় পোস্ট অফিসে যাওয়া শুরু করলাম রোজ। কারণ, বেতার থেকে যদি উত্তর আসে। ৭৩ সালে পাঠালাম। মার্শাল ল’ চলছে। তখন আমার কাজ একটাই, প্রতিদিন ডাক আসার সময় পোস্ট অফিসে হাজিরা দেওয়া। সেটা করতে গিয়ে আমার জানা হলো, গ্রামে কার চাকরি হলো, কার প্রেম হলো, কার টাকা আসলো, কার আত্মীয় মারা গেলো- সব। একটা সময় আমি নিজেই পিয়ন হয়ে গেলাম। আমি গেলেই পোস্টমাস্টার আমার হাতে চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বলতো- অমুকের বাড়িতে পৌঁছায়ে দিও। এভাবে টানা ৮ বছর আমি চিঠির উত্তরের জন্য পোস্ট অফিসে গিয়েছি। ৮১ সাল পর্যন্ত। সেই চিঠি আর আসেনি তারাকান্দি পোস্ট অফিসে।’
শহীদুল্লাহ ফরায়জী ভেবে নিলেন, সেখানেই বুঝি গানের মৃত্যু ঘটলো।
মৃত্যু—দুই.
পোস্ট অফিসের টান ভুলে ফের রাজনীতিতে ব্যস্ত হলেন শহীদুল্লাহ। দেশে চলছিল চরম অস্থিরতা। ৭৫ সালের পর দুর্ভিক্ষ ভয়াবহ রূপ নিলো। শহীদুল্লাহ ফরায়জী নিজেকে নিবেদিত করলেন অনাহারি মানুষদের সাহায্যে।
‘এমনও মানুষ দেখেছি, না খেতে খেতে শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। এমনই একজনকে কতো চেষ্টা করেছি বাঁচানোর। শেষে আর খাওয়াতে পারিনি। আমাদের গ্রামেই ইউনিয়ন বোর্ডের বারান্দায় পড়ে ছিল। তারপর এভাবে আমার চোখের সামনেই মারা গেলো।’ বিষণ্ণ মনে আরেকটি মৃত্যুর খবর দিলেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী। যে মৃত্যুকে তার জীবনের সবচেয়ে দগদগে ক্ষত হিসেবে আজও লালন করছেন কবি।
ফরায়জী বলেন, “বেলা ৩টায় মারা গেলো কঙ্কালের মতো লোকটা। দাফনের ব্যবস্থা আমাকে উদ্যোগী হয়ে করতে হলো। কিন্তু টাকা তো নাই কারও কাছে। বাস থেকে টাকা তুললাম। ১২০ টাকা উঠলো। কাফন হলো, কিন্তু কবরখানা তো পাচ্ছি না। কেউ রাজি হয় না লোকটাকে দাফন করার জন্য। পরিচিত একজন পুকুরপাড়ের কোনায় পাঠালেন। মসজিদের হুজুরও বাড়ি চলে যাচ্ছে হারিকেন হাতে। জানাজা পড়ার লোকটাও নাই। রাত হয়ে গেছে। এরপর মানুষ চারজনে জানাজা পড়ে দাফন করে রাত ৮টার দিকে বাড়িতে ফিরছিলাম ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার। ভয়ে কাঁপছিলাম। একদিকে অন্ধকার, অন্যদিকে লাশ নিয়ে কবরে নেমেছি। রাতে জ্বর উঠে গেলো ১০৩। এখনও আমার শৈশব বলতে দুটো জিনিস মনে পড়ে। একটা হচ্ছে এই কঙ্কাল মানুষটা, আরেকটা হলো ‘চাচি বাত দেন’ এই সংলাপটি। এটাই আমার শৈশব। এর বাইরে আর কিছু মনে নাই। কী করুণ করে ভাত চাইতো, সেটা অসহ্য করুণ ছিল শোনাটা। এখনও আমার কানে প্রতিধ্বনিত হয়।’
সম্ভবত এভাবেই নিজের অজান্তে অন্তর্ভেদী গীতিকবির অন্যতম নজির হয়ে ওঠেন গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী। তার গানের কথায় মৃত্যু বারবারই উঠে এসেছে নানান রঙে রূপক অর্থে অন্য উচ্চতায়। প্রচলিত আছে, বাংলা সংগীতের ক্যাসেট অধ্যায়ে তার মতো করে জীবন, প্রেম ও মৃত্যুকে একসুতোয় গাঁথতে পারেনি আর একজনও। যার গীতিকবিতায় ছায়া হয়ে নানাভাবে ধরা দেন লালন।
ফলে অনুমান করা যায়, দ্বিতীয় মৃত্যুটি শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে সমৃদ্ধ গীতিকবি হয়ে ওঠার পেছনে সহায়তা করে অদৃশ্যে। যদিও বেতার থেকে তার লেখা ২৫ গানের স্বীকৃতি হাতে পৌঁছায়নি তখনও (১৯৮১)। এ বিষয়ে অবশ্য শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সরল স্বীকারোক্তি, ‘ওগুলো গানই তো হয় নাই। উত্তর আসবে কেমন করে?’
মূলত এই সত্যটি মেনে নিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন, তাকে দিয়ে আর যাই হোক গানবাজনা হবে না।
‘তারপর আবার পুরোদমে জাসদের রাজনীতিতে ঢুকে পড়লাম। এরমধ্যে ক্ষমতায় (১৯৮৩) এরশাদ। ৮৭/৮৮ সালের দিকে রাজনীতি আবার উত্তাল। জাসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে নির্দেশ এলো, আমাকে ঢাকা যেতে হবে। রব ভাই (অ স ম আব্দুর রব) তখন সংসদে বিরোধী দলের নেতা। অনেক প্রভাবশালী নেতা। ঢাকায় চলে এলাম। রব ভাই আমাকে সংসদে যাওয়া-আসার ব্যবস্থা করেন। সেখানে কী হয় সেগুলো দেখতে থাকলাম। সংবিধান নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম রব ভাইয়ের নির্দেশনায়। তখন আমি হয়ে উঠলাম রব ভাইয়ের সংবিধান ও সংসদীয় গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। মাঠের রাজনীতি আর আমার হচ্ছিল না।’ ঢাকার রাজনৈতিক জীবন প্রসঙ্গে বললেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী।
তখনও তিনি গানের বাইরে। বাইরে মানে একেবারেই বাইরে। সংসদ আর সংবিধানে ডুবে আছেন রাতদিন। গান যে লিখতে চেয়েছিলেন, সেই কথাটুকুও মাথায় আর নেই। এরমধ্যে ১৯৮৯ সালের দিকে রেডিওর কর্মীরা কর্মবিরতিতে যায়। দিনরাত রেডিওতে শুধু মিউজিক বাজে। না খবর, না গান, না ঘোষণা। যেটা রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর সিগন্যাল।
ফরায়জীর ভাষায়, ‘তখন কিন্তু রেডিও শুনেই জনগণ নির্ধারণ করতো সরকার আছে নাকি পড়ে গেছে! ফলে রেডিওতে টানা মিউজিক বাজা মানে হলো জনগণ ভাববে সরকার আর নেই! তখন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে রেডিও ধরতো সরকার আছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। কারণ, বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমানের খুনের খবর তো মানুষ রেডিওতেই শুনেছে। তার আগে কেউ তাদের খবরটা দেয়নি। ফলে রেডিওতে কিছু শুনতে না পাওয়া মানে রাষ্ট্রের কোনও জটিলতা চলছে। ফলে সারা দেশে একটা গুঞ্জন শুরু হলো, সরকার নাই নাকি? রেডিওতে খালি মিউজিক বাজে কেন? তখন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদের কাছে এই বার্তাটা যায়। সেটি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করি রব ভাইকে দিয়ে। তিনি সংসদে যেন বক্তৃতা দেন- বিষয়টি নিয়ে।’
টের পাচ্ছেন তো, রেডিওর একটি চিঠির জন্য দূর তারাকান্দি গ্রামের যে কিশোর টানা ৮টি বছর অপেক্ষায় ছিল, তার মাধ্যমেই বেতার কর্তাদের পক্ষে কথা ওঠে জাতীয় সংসদে! এমনকি খোদ বেতার কর্তারা এসে সেই শহীদুল্লাহ ফরায়জীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যান, তাদের দাবি-দাওয়া ঠিক করে দেওয়ার জন্য।
ঘটনাপ্রবাহ মুখে নিয়ে এগিয়ে গেলেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী। দীর্ঘ আলাপের এই পর্যায়ে এসে তার চোখে-মুখে খানিক আনন্দের আলো মিললো। মনে হলো, বাবাহারা এতিম ছেলেটি সমাজ বদলের যে স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতির মাঠে নামলো স্কুল জীবনে; সেটি বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পেলেন দীর্ঘ সময় পেরিয়ে।
‘‘এরমধ্যে রেডিওর কয়েকজন কর্মকর্তা রব ভাইয়ের কাছে এলেন। বললেন, ‘সরকার তো আমাদের কথা শুনছে না, আপনি আমাদের হয়ে একটু বলুন।’ রব ভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘এগুলা আমাকে বলার চেয়ে ফরায়জীকে বলেন। ও এসব দেখে। এরপর ওর কাছ থেকে শুনে-বুঝে যা করার করবো। এরপর রেডিওর এডি (অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টর) ফিরোজ ইসলাম আমার কাছে এসে বললেন, ‘ভাই আমাদের এই দাবি।’ সব শুনলাম। সেভাবে একটা বক্তব্য রব ভাইকে লিখে দিলাম। বললাম, আজকের মধ্যে ওদের দাবি না মানলে সারা দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। এটা যেন প্রধানমন্ত্রীকে তিনি বলেন। রব ভাইয়ের কথা শুনে এরপর প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর বক্তব্য দিলেন, ‘এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রেডিওর সব দাবি আমরা মেনে নিয়েছি।’’ এভাবেই ৮৯ সালে রেডিওর আন্দোলন বন্ধ করার বিষয়ে সরাসরি কাজ করেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী।
যদিও গল্পটা এখানেই শেষ নয়। বরং গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জীর নতুন জন্ম হয় এখান থেকেই। অনেকেই আগাম ধরে নেবেন, রেডিও কর্মকর্তাদের পক্ষে কাজ করার বিনিময়ে বিপুল গান লেখার সুযোগ পেয়ে গেলেন অ স ম আব্দুর রবের রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী! মোটেও তা নয়। বলে রাখা দরকার, আজকের দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতারে তিনি গান লিখেছেন মোটে ৬-৭টি! সেটাও অনেক পরে।
তার আগে রেডিওর গল্পটা শেষ করা যাক। কারণ, এখানে রয়েছে নিদারুণ মজার এক ঘটনা।
শহীদুল্লাহ বললেন, ‘‘রেডিওর সবাই তো আমার ওপরে মহাখুশি। ফিরোজ ইসলাম ছুটে আসলেন আমার কাছে। বললেন, ‘ফরায়জী ভাই আপনার জন্য কী করতে পারি? যা উপকার করলেন আমাদের।’ আমি মজার ছলে রেগে বললাম, ‘ধুর মিয়া। কথাই বইলেন না। ২০ বছর আগে আমি গান পাঠাইছি। ৮ বছর কাটাইছি পোস্ট অফিসে। আপনারা উত্তরই দিলেন না।’ উনি তো আমার কথা শুনে অবাক ও বিব্রত। বলে, ‘কি বলেন!’। ঠিক তিন দিন পর আমার নামে চিঠি নিয়ে তিনি নিজেই চলে আসলেন। আমি নাকি রেডিওর এনলিস্টেড গীতিকার! এভাবেও যে রেডিওর উত্তর পাবো, ভাবিনি।’’
রেডিওর অতি কাঙ্ক্ষিত চিঠিটি হাতে পেয়েও খুশি হতে পারলেন না শহীদুল্লাহ ফরায়জী। কারণ, ততদিনে গান-ভাবনা থেকে হাজার মাইল দূরে সরে এসেছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এখন এই সার্টিফিকেট নিয়ে আমি কী করবো। আমি তো সংসদ আর সংবিধানে ঢুকে গান-কবিতার সঙ্গে আর নাই। দেশ উত্তাল, নিয়মিত হরতাল অবরোধ। আমরা সরকার পক্ষের বিরোধী দল! আওয়ামী লীগ আর বিএনপি রাজপথে আন্দোলন জমিয়ে তুলছে। এটা ১৯৮৯ সালের শেষের দিকের কথা।’
অনেকটা এই সময়ের জাতীয় পার্টির মতোই ছিল তখনকার জাসদের অবস্থা! বিরোধী দল জাসদের রাজকীয় অফিস। সেখানে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর বিশাল অফিস রুম। হাজার মানুষের আনাগোনা তার দরবারে।
অস্থির পাঠকরা এবার নিশ্চয়ই তৃতীয় মৃত্যুর অপেক্ষায় আছেন! স্বাভাবিক। কারণ, দুটি মৃত্যুর পরেও গানে হাতেখড়ি হলো না শহীদুল্লাহ ফরায়জীর। এবার নিশ্চয়ই হবে।
মৃত্যু—তিন.
এই মৃত্যুটি শহীদুল্লাহ ফরায়জীর জীবনে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়ার মতো। আবার এই মৃত্যুর মধ্য দিয়েই হয়তো আপাদমস্তক রাজনীতিক শহীদুল্লাহকে টেনে নিয়ে গেছে অন্তর্ভেদী অমূল্য সব গীত রচনার দিকে। তার আগে জেনে নেওয়া যাক রেডিওর সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে বিটিভিতে যুক্ত হওয়ার গল্পটা।
‘একদিন কোনও কাজে বিটিভির সুরকার শাহনেওয়াজ ভাই এলেন আমাদের দলীয় অফিসে। তখন বিরোধী দলের প্রধান নেতার (অ স ম রব) অফিস। আমার জন্যই বিশাল রুম বরাদ্দ। তো শাহনেওয়াজ ভাই এসে বসলেন আমার সামনে। চিনতাম না। সেদিন আমাদের কথোপকথন ছিল এমন-
বললাম, আপনি কে?
বললেন, আমি বিটিভির সংগীত পরিচালক শাহনেওয়াজ।
অবাক হয়ে বললাম, কী?
বললেন, কেন, কী হয়েছে!
বললাম, আমি তো সংগীত পরিচালক খুঁজতেছি।
বললেন, আপনি কি গান লেখেন?
বললাম, চেষ্টা করি।
বললেন, তো বাসায় আসেন।
ঠিকানা নিয়ে তার বাসায় গেলাম। এটা ঠিক ৯০ সালের কথা। রেডিও তো আমাকে গীতিকার বানায়ে চলেই গেলো। আর তো ডাকলো না গান লেখার জন্য।’
হতে পারে সেই অভিমান বা আক্ষেপ থেকে বিটিভির সংগীত পরিচালক শাহনেওয়াজের বাসায় যান শহীদুল্লাহ ফরায়জী। দেখালেন তার লেখা, ‘তুমি বিশ্বাসের পাহাড়ে/ ঝরনা কেটে গেছো চলে/ তবু কোনও অভিযোগ করিনি...।’ গানটি দেখে শাহনেওয়াজ বললেন, ‘আরে ভালো লেখেন তো।’
না। এমন মন্তব্যে বাতাসে গা ভাসাননি কবি। মনে মনে বললেন, ‘আমি তো গান লেখার ফরমেটই জানি না। যা মনে এসেছে লিখেছি।’ মনের কথাটা মুখে না বলে তখন অন্য প্রশ্ন করলেন শাহনেওয়াজকে, ‘আমি তো রেডিওতে এনলিস্টেড, টিভিতে না। তাহলে গান হবে কেমন করে?’ উত্তরে বললেন, ‘আরে রেডিওতে হইছেন, টিভিতে কতক্ষণ। আপনি কত বড় সংসদ চালাচ্ছেন।’
শহীদুল্লাহ ফরায়জী বুঝলেন, গানের জোরে নয়, সংসদের জোরেই তিনি বিটিভিতে গান লেখার সুযোগ পাচ্ছেন। যদিও নিজের কাব্যিক শক্তি নিয়ে আত্মবিশ্বাস ছিল তার। এরমধ্যে তার লেখা দুটি গানের সুর হয়ে গেলো। রেকর্ডিংয়ের তারিখও হলো। ‘বিশ্বাসের পাহাড়’ গাইবেন রফিকুল আলম। আর শাম্মী আক্তার গাইবেন ‘নিন্দুকেরা যতই আমায় মন্দ বলুক’ নামের আরেকটি গান। দুজনই তখন তারকা শিল্পী। এসব তথ্য পেয়ে তো শহীদুল্লাহ ফরায়জী হাতে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা। অপেক্ষা শুধু গান রেকর্ডিংয়ের। এটা ৯০ সালের জুলাই মাসের ঘটনা। বিটিভি’র স্টুডিওতে রেকর্ডিংয়ের তারিখ পড়লো ২৯ জুলাই।
সেই গল্পটি এভাবে বললেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী, ‘‘আমি তো রব ভাইয়ের সাথে গুলশানে থাকি। শাহনেওয়াজ ভাই থাকে মতিঝিল। আমি আগের দিন রাতেই চলে গেছি মামার বাসা গেণ্ডারিয়ায়। যেন শাহনেওয়াজ ভাইয়ের বাসায় যেতে দেরি না হয়। উনি নিয়ে যাবেন বিটিভিতে। যথারীতি রাতে ঘুম নাই। সারা রাত বিছানায় ওলট পালট করে কাটিয়েছি। ২৯ জুলাই সকাল ৮টায় শাহনেওয়াজ ভাইয়ের বাসায় গিয়ে হাজির। অথচ যাওয়ার কথা ১২টার দিকে। দরজা খুলে শাহনেওয়াজ ভাই বললেন, ‘এত সকালে?’ লজ্জা পেয়ে বললাম, ‘আজকে না রেকর্ডিং। তাই সকাল সকাল চলে আসলাম।’ এরপর ঘরে বসালেন। বসে আছি। নাশতার প্রস্তুতি চলছে। আর আমার মধ্যে কারণ ছাড়াই অস্থিরতা বাড়ছিল।’’
প্রথম গান রেকর্ডিং। নির্ঘুম রাত আর অস্থির দিন তো যাবেই। কিন্তু এর পেছনেও রয়েছে আরেকটি বড় অধ্যায়। সেদিন সকালেই সামনে নাশতা আসার আগে শাহনেওয়াজের বাসার ল্যান্ডফোন বেজে উঠলো। অ স ম আব্দুর রবের ভরাট কণ্ঠ। শহীদুল্লাহ ফরায়জীর খোঁজ। নির্দেশ, জরুরি কাজে তাকে দ্রুত গুলশানের বাসায় যেতে হবে। এমন নির্দেশে যেন মাথায় বাজ ভেঙে পড়লো শহীদুল্লাহ ফরায়জীর। আর্জি করা হলো, আজ তার প্রথম গানের রেকর্ডিং। তাতেও কাজ হলো না। যেতেই হলো, পেছনে রেকর্ডিংয়ের মোহ ফেলে। কারণ, ততক্ষণে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমালেন শহীদুল্লাহ ফরায়জীর মা সখিনা খাতুন। যিনি শুধু মা-ই নন, বাবা-ও; শহীদুল্লাহ ফরায়জীর জীবনে।
সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ আজও স্পষ্ট শহীদুল্লাহ ফরায়জীর কাছে। বললেন, ‘‘আমি বসে ছিলাম। শাহনেওয়াজ ভাইয়ের বাসায় হঠাৎ একটা ল্যান্ডফোনের রিং বাজলো। হঠাৎ আমার মনে হলো, আমাকে কেউ খুঁজছে না তো! সঙ্গে সঙ্গে শাহনেওয়াজ ভাই এসে বললেন, ফরায়জী ভাই আপনের টেলিফোন। রব ভাইয়ের গলা মনে হলো।
ফোন ধরে বললাম: হ্যালো...।
বললেন: তুমি কই? ও আচ্ছা তুমি তো শাহনেওয়াজের বাসায়। তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় আসো।
বললাম: ভাই আমার তো গান রেকর্ডিং।
বললেন: না, তুমি বাসায় আসো এখনই। আচ্ছা অপেক্ষা করো। গাড়ি যাচ্ছে।
ফোন রেখে দিলো। কিছুক্ষণ পরই গাড়ি হাজির বাসার গেটে। মানে ফোন করার আগেই গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন রব ভাই। আমার তো অস্থির লাগছে, রাগও লাগছে। রব ভাই কেন এমন করছেন। গাড়িতে উঠলাম। বাসায় গেলাম। রব ভাই বললেন, ‘খালাম্মার শরীর খারাপ (মানে আমার মা)। ময়মনসিংহ থেকে খবর এসেছে। তুমি এখনই রওয়ানা দাও।’ রব ভাইয়ের গাড়ি দিয়েই আমাকে বাড়ি পাঠালেন। বাসে না। কারণ, দেরি হবে।
আমি যেতে যেতে ভাবলাম, মা অসুস্থ হলে তো রব ভাই এমন করতেন না। গাড়ি দিয়ে দিলেন। রেকর্ডিং করতে দিলেন না। মনে ডাক দিলো মা বুঝি আর নাই। বাড়ি গিয়ে দেখি তা-ই হলো। মা আর নেই।’’
শহীদুল্লাহ ফরায়জীর জীবনে এটিই তৃতীয় ও শেষ মৃত্যু, যা তাকে শিখিয়েছে জীবনের ভেতরের জীবনটাকে খুঁড়ে বের করতে। একদিন পরই তারাকান্দি থেকে ঢাকায় ফিরলেন। বললেন, ‘প্রথম গান রেকর্ডিং, মায়ের মৃত্যু- নিজেকে কী বলবো। কী বুঝাবো। একদিন পরই ঢাকায় চলে এলাম। মাকে তো আর পেলাম না। গানের টানেই বলতে পারেন ঢাকায় ফিরলাম। শাহনেওয়াজ ভাই জানালেন, ভালোই রেকর্ড হয়েছে। ৪ আগস্ট প্রচার হবে দুটো গানই! মনে হলো, মায়ের বিনিময়ে পেলাম এই গান। খবরটা শুনে আবার বাড়ি গেলাম। কারণ, না গেলে খবরটা এলাকার মানুষকে জানাবো কেমন করে? এটা তো জানানো জরুরি। না জানালে গান লিখে লাভ কী?’
গ্রামে গেলেন। বড়মুখ করে মোটামুটি সবাইকে জানাতে শুরু করলেন। অপেক্ষায় থাকলেন ৪ আগস্টের। নিজেদের ঘরে টিভি নেই, চাচাতো ভাইয়ের টিভিটা ফিক্স করলেন। এরমধ্যে দুশ্চিন্তাও ঘিরে ধরেছে। মনে ভয়, গান দুটো সঠিক তারিখে প্রচার হবে তো? কারণ, তিনি তো এনলিস্টেড না। দেশের পরিস্থিতিও উত্তাল। গান প্রচার হলেও যদি নামটা না দেখায়? এসব দুশ্চিন্তা চেপে ধরলো শহীদুল্লাহ ফরায়জীকে।
আশার কথা, সব দুশ্চিন্তা কাটিয়ে যথাসময়ে গান দুটি প্রচার হলো। নামও দেখালো পর্দায়। খুশির রোল উঠলো শহীদুল্লাহ ফরায়জীর গ্রামে। কবির ভাষায়, ‘এই প্রথম গান লেখার শক্তি পেলাম। মুক্তিযুদ্ধের পর আবারও মনে হলো গান দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায়, গানটা লেখা যায়।’
মৃত্যু—চার
তখন ৯০ সালের শেষদিক। উত্তাল দেশ। গান করার সময় সুযোগ পাচ্ছেন না। পলিটিক্যাল ব্যস্ততা তুমুল। এরমধ্যে কনকচাঁপার জন্য আরেকটা গান করেছেন শাহনেওয়াজ। এভাবে আরও ৪-৫টা গান লিখেছেন বিটিভির জন্য। এরমধ্যে সরকার পতন! আ স ম আব্দুর রব জেলে। ৯১ থেকে ৯৬ সালের মধ্যে আবার গানের বাইরে চলে যান শহীদুল্লাহ। কারণ, ফুলটাইম পলিটিক্স, আদালত আর জেলখানায় দৌড় ছিল তার।
দৌড়ের ফল এলো। আবার ক্ষমতার দেখা পেলেন শহীদুল্লাহ ফরায়জী ও তার দল। আ স ম আব্দুর রব ৯৬-এর নির্বাচনে হয়ে গেলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। একই সময়ে পরিচয় ঘটে বিটিভি ঘরানার কণ্ঠশিল্পী মোখলেসুল ইসলাম নীলুর সঙ্গে। প্রস্তাব পেলেন গান করার। তবে রেডিও বা বিটিভির জন্য নয়। একেবারে নতুন একটি মাধ্যমে। যা শহীদুল্লাহ ফরায়জী আবিষ্কার করেন নীলুর মাধ্যমে। তাদের কথোপকথনটি ছিল এমন—
নীলু বললেন: চলেন গান করি একসঙ্গে।
বললাম: কী গান?
বললেন: ক্যাসেটের গান। আমরা গান করে কোম্পানিতে জমা দিবো।
বললাম: তাই নাকি? ক্যাসেট সম্পর্কে কিছু জানি না তো।
বললেন: স্টুডিওতে গান রেকর্ড করবো।
বললাম: স্টুডিও কেমন। বিটিভিতে?
বললেন: না। বাইরে। আপনি একদিন আসেন।
এরপর গেলেন কাকরাইল মোড়ের একটি স্টুডিওতে। নাম মনে করতে পারছিলেন না। এটা ৯৬-এর ঘটনা। সেখানেই দুজনে ১২টি গান রেকর্ড করলেন। সবগুলো গানের সুর মোখলেসুল ইসলাম নীলুই করেছেন। অ্যালবামের নাম দিলাম ‘নিও না আমার খবর’। একটি ছোট প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে সেটি বের হয়। মূলত এরপর থেকেই অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে শহীদুল্লাহ ফরায়জীর জয়রথ শুরু হয়। কাজ শুরু করেন দেশের নামকরা সব সুরকার ও শিল্পীর সঙ্গে। অ্যালবাম প্রকাশ হয় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে।
ফরায়জী বলেন, ‘‘৯৭ সালে বেইলি রোডে শুনলাম একটা নতুন স্টুডিও হলো। অডিও আর্ট। মন্ত্রীর (আ স ম রব) সঙ্গে থাকি। তাই এরমধ্যে অনেকেই আমাকে একটু একটু চিনে। তো স্টুডিওতে গিয়ে পরিচয় হয় রেকর্ডিস্ট পান্না ভাইয়ের সঙ্গে। উনি বললেন, ‘আপনি কি রব ভাইয়ের সঙ্গে আছেন?’ বললাম, হুম, পলিটিক্যাল সেক্রেটারি ওনার। এরপর বসলাম। বললাম, আমি তো গান করতে চাই। কাকে দিয়ে করানো যায়। মানাম আহমেদ ভাই হলে মনে হয় ভালো হয়। কাজ হলো। পান্না ভাই মানাম ভাইয়ের সঙ্গে সিটিং দিয়ে দিলেন। ৯৮ সালে আমরা সাউন্ডটেক থেকে প্রকাশ করলাম ‘কষ্ট আমার’ নামের অ্যালবাম। গাইলেন ১২ জন তারকা। বলা যায়, এই অ্যালবাম দিয়েই আমার নামটা ফুটে যায় সারা দেশে।’’
এরপর টানা নিজ কথায় ১৮টি অ্যালবাম প্রকাশ হয় শহীদুল্লাহ ফরায়জীর। এরমধ্যেই কবির সঙ্গে পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে মরমী শিল্পী ও বাঁশি বাদক বারী সিদ্দিকীর সঙ্গে। যে শিল্পীর সঙ্গে সর্বোচ্চ মেলবন্ধন ঘটে এই গীতিকবির। জুটি হয়ে তারা সর্বাধিক শতাধিক গান করেন। যার বেশিরভাগই তাত্ত্বিক ও সফল।
বললেন, ‘‘বারী ভাই তখন বাঁশি বাজায়। গায়ক হিসেবে পরিচিত না। তার সঙ্গে কেন জানি একটা সখ্য গড়ে উঠলো আমার। ১৯৯৮ সালের কথা। একদিন হুট করে বললাম, বারী ভাই আপনি আমার গানে সুর করেন। এরমধ্যে হুমায়ুন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমার গানও প্রকাশ হলো। বারী ভাইয়ের গান হিট। কিন্তু কেউ কাজ দিচ্ছে না তাকে। বললাম, আমার লেখা সুর করেন। প্রস্তাব পেয়ে খুব অবাক হলেন। খুশিও হলেন। সুর করলেন ‘প্রেমের শরীর ফেলে দেবো আগুনে...’। গানটা দশ মিনিটে সুর করে দিলেন। মুগ্ধ হলাম। এরপর ওনার মৃত্যু পর্যন্ত আমরা গান করেছি একসঙ্গে। যা গান করেছি, তারচেয়ে বেশি তাত্ত্বিক আলাপ করেছি। আমাদের আলাপ অনেক জমতো। সেই আলাপের মানুষটাও আজ নেই। অডিও ইন্ডাস্ট্রিও শেষ। আমার লেখাতেও নেমে এলো ছন্দপতন।’’
এবং মৃত্যুঞ্জয়ী
এভাবেই ক্রমশ মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠেছেন গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী। বেছে নিয়েছেন অবৈবাহিক একক ভিন্ন জীবন। কিন্তু এই অধ্যায়ে এসে একা লাগে না? কিংবা মনে হয় না, সংসারী না হয়ে ভুল করেছেন! জবাবে আধশোয়া থেকে উঠে বসলেন ৬৫ বসন্তের তরুণ। বললেন, ‘আমি যদি জীবনে একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি অথবা একটা ভালো কাজ করে থাকি, সেটা হলো এই একা থাকা। আমি যদিও আবারও জন্মাই, তখনও এই সিদ্ধান্তেই অটল থাকবো। এটা নিয়ে আমার মধ্যে কোনও বিষণ্ণতা নেই, বরং আনন্দ আছে। আমি ভালো আছি। দেশ, মানুষ আর গান- আমার সঙ্গে আছে।’
আর্থিক বিবেচনায় নির্মোহ এই মানুষটি থাকেন রাজধানীর এক কামরার একটি ঘরে; তার রাজনৈতিক গুরু আ স ম আব্দুর রবের বাড়িতে। সাদামাটা জীবনের চূড়ান্ত উদাহরণ হতে পারেন তিনি। শুনলে অবাক হবেন, তার লেখা গানের সংখ্যা সাত শতাধিক। যার একটিরও কপিরাইট নিজের কাছে রাখেননি। স্বেচ্ছায় দিয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের হাতে।
এই অসময়েও যিনি পরিকল্পনা করছেন চলমান গানের ফরমেট ভেঙে নতুন কিছু করার। যার মাধ্যমে মৃত অডিও ইন্ডাস্ট্রিকে আবার বাঁচিয়ে তুলবেন। তার ভাষায়, ‘অডিও ইন্ডাস্ট্রিকে তো আমরা গড়েছি। আবার আমরাই মেরেছি। বাইরের কেউ এসে তো এটাকে শেষ করেনি। ফলে সেই ইন্ডাস্ট্রির বেশিরভাগ মানুষ আমরা এখনও বেঁচে আছি। আমরা যদি আবার ভাবী, নতুন কিছু; তাহলে তো সম্ভব। এরমধ্যে আমি ভেবেছি। পরিকল্পনা আছে। দেখা যাক নতুন কিছু করতে পারি কিনা।’
একাধিক মৃত্যু পেরিয়ে এভাবেও মৃত্যুঞ্জয়ী হন কেউ কেউ।
এক নজরে শহীদুল্লাহ ফরায়জী
জন্ম
১৯৫৮ সালের ১৭ জুলাই
জন্মস্থান
তারাকান্দি, ময়মনসিংহ
বাবা
সাইদুর রহমান ফরায়জী
মা
সখিনা খাতুন
শিক্ষাজীবন
ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজ
বৈবাহিক
সিঙ্গেল
গানের সংখ্যা
সাতশ’ প্রায়
প্রকাশের মাধ্যম
মূলত অডিও অ্যালবাম, রেডিও-টিভি-সিনেমায় প্রায় ২০টি গান
ব্যস্ততা
রাজনীতি (জাসদ) ও রাজনৈতিক কলাম লেখা
নেশা
গান রচনা ও সংবিধান পর্যালোচনা
বই
দুটি কবিতার বই (৯৬/৯৭ সাল)
ব্যর্থতা
আমার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কোনও আক্ষেপ নেই। তবে গানের স্বীকৃতি নিয়ে আক্ষেপ আছে। গান সাহিত্যের অংশ। অথচ দেশে সাহিত্যের আসর হয়, কোথায় গানের স্বীকৃতি নেই। রবীন্দ্রনাথ বা বব ডিলান সেটা প্রমাণ করেছেন। এটাও প্রমাণিত, যতক্ষণ পর্যন্ত সংগীত হয় না, ততক্ষণ একটা রাষ্ট্র হয় না। সেই সংগীতই স্বীকৃত হলো না সাহিত্যের বিচারে। আমরাও প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি গান যে সাহিত্যের অংশ। বাংলা একাডেমি কবিতার জন্য প্রতিবছর পুরস্কৃত করে, কিন্তু গীতিকবিতা পায় না। এটা আমাদের ব্যর্থতা। এটাই আমার আক্ষেপ।
নিজের লেখা পছন্দের ১২ গান
১. কী যাতনা প্রেমে পড়া, সুর-কণ্ঠ: বারী সিদ্দিকী
২. যাবো যখন পরপার, সুর-কণ্ঠ: বারী সিদ্দিকী
৩. মনেরই আয়নাতে, সুর: বারী সিদ্দিকী, কণ্ঠ: আসিফ আকবর
৪. রঙ্গিলারে কেন বুঝো না, সুর: বারী সিদ্দিকী, কণ্ঠ: রুনা লায়লা
৫. প্রাণের চেয়ে বেশি প্রিয়, সুর: নাজির মাহমুদ, কণ্ঠ: সাবিনা ইয়াসমিন ও বাঁধন
৬. যদি এতটুকু করো পর, সুর: কুমার বিশ্বজিৎ, কণ্ঠ: কুমার বিশ্বজিৎ ও সামিনা চৌধুরী
৭. পাপের ঘর, সুর: প্লাবন কোরাইশি, কণ্ঠ: রাজু মণ্ডল
৮. খুচরো পয়সা, সুর: প্লাবন কোরাইশি, কণ্ঠ: রাজু মণ্ডল
৯. সোনাদানা দামি গহনা, সুর: মানাম আহমেদ, কণ্ঠ: আলম আরা মিনু
১০. আমি ছিলাম মাটির ওপর, সুর ও কণ্ঠ: এস আই টুটুল
১১. চন্দ্র সূর্য কার, সুর: পল্লব স্যান্নাল, কণ্ঠ: এন্ড্রু কিশোর
১২. এমন ভালো বাসবো তোমায়, সুর: শওকত আলী ইমন, কণ্ঠ: ন্যানসি
পছন্দের গীতিকবি
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান; এই তিন জনের বাইরে আরও আছে! আছে অনেকে। ছোট-বড় অনেকের গানই পছন্দ হয়। তবে নাম উল্লেখ করলে এই তিন জনের নামই আসে মনে। কিন্তু আমি তাদের কারও দ্বারা উদ্বুদ্ধ নই। আমি আমার মতো করেই যা করার করেছি। তবে লালনের একটা প্রভাব আমার ভেতরে কাজ করে বলে টের পাই।
বন্ধুত্ব
বারী ভাই, বারী সিদ্দিকী। ওনার সঙ্গে ফিলোসফিক্যাল আলাপটা জমতো আমার। জীবনবোধ নিয়ে প্রচুর কথা হতো। এই আরামটা পেতাম।
কুমার বিশ্বজিৎ। একজন রুচিশীল মানুষ। রুচির বাইরে কিছু করেন না। আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ কম, কিন্তু নৈকট্য অনেক।
জুলফিকার নিউটন। একজন লেখক। ওনার সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক। আমার গান রচনার প্রধান উৎসাহদাতা এই মানুষটি।
ওনাদের বাইরে সুরকার পল্লব স্যান্নাল আর মিল্টন খন্দকারের সঙ্গেও আমার আত্মিকতা রয়েছে।
পরিকল্পনা
ফোক, ক্লাসিক, আধুনিক তো করেছি। কিন্তু কথা ও সুরে একটা বৈচিত্র্য আনতে চাই এবার। ভাবছি বেশ কদিন ধরে। কীভাবে একটা বদল আনা যায়। এমন একটা প্যাটার্ন আনার চেষ্টা করছি। আগের লেখার ফরমেটও বদলে ফেলতে চাইছি। সুর-কম্পোজিশনেও পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন একটা ধারা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে...।
হতাশা
আরও বেশি গান করার কথা ছিল আমার। নিজেই গান করবো, সেটা তো সবসময় ভালো লাগে না। অন্যের কাছ থেকেও যদি লেখার প্রস্তাব পেতাম, ভালো লাগতো। আরও গান লেখা হতো।
তরুণ গীতিকবিরা
ভালো। বেশ ভালো। নাম বলছি না। তবে অনেক ভালো ভালো লেখক আছে এখনও। কিন্তু গান করার প্ল্যাটফর্ম তো আর নাই। এক হাতে তো তালি বাজে না। তালিটা বাজানো জরুরি। না হলে এই ভালোরাও হারিয়ে যাবে, অভাবে-অভিমানে।
ছবি: মাহমুদ মানজুর