জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, ‘রানা প্লাজা ধসের মতো বিভীষিকাময় ঘটনা শুধু দেশের জন্য নয়, পৃথিবীতে শ্রম-বিপর্যয়ের সবচেয়ে নৃশংস এবং ধ্বংসাত্মক ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এত বড় বিভীষিকাময় ঘটনার পরও দেশের শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। এর জন্য দায়ী দুর্বৃত্তায়িত, নষ্ট ও পচে যাওয়া রাজনীতি। এ অবস্থায় জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে রানা প্লাজা ধসের দিনটিকে জাতীয় শ্রমিক দিবস ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি।’
বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে এক যুগ পূর্তিতে রানা প্লাজার সামনে এনসিপির উদ্যোগে আয়োজিত ‘স্মরণ ও সংস্কারে শ্রমিকের বন্দোবস্ত’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। সভায় দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন করা হয়। সেদিন আমরা শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলি। একইভাবে বাংলাদেশের শ্রমিক যারা আছেন, তাদের নিরাপদ কর্মস্থলের জন্য, ন্যায্য মজুরির জন্য, শ্রমের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ২৪ এপ্রিলকে জাতীয় শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। এদিন সব গার্মেন্টস কারখানাসহ যতগুলো শ্রমিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সবগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে হবে। এই দিনে সরকারের তরফ থেকে রিপোর্ট পেশ করতে হবে—কোথায় কোথায় সরকার বিগত এক বছরে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যেসব ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থল আছে—সেগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, সেই তালিকা প্রতি বছর ২৪ এপ্রিল জাতীয় শ্রমিক দিবসে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি রানা প্লাজায় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবার এবং যারা আহত ও পঙ্গু হয়েছেন—তাদের অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, পুনর্বাসনের আওতায় আনতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিকদের জন্য সরকারের তরফ থেকে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল অবশ্যই স্থাপন করতে হবে। রানা প্লাজার ঘটনায় যেসব অনুদান এসেছে, সেসব অনুদান যেসব সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তরা মেরে দিয়েছে তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সেইসঙ্গে সেসব অনুদানের টাকা শ্রমিকদের মাঝে ন্যায্যভাবে বণ্টন করতে হবে।’
আখতার হোসেন বলেন, ‘এর পরের ঘটনা আরও বিভৎস—এখানে বহু মানুষ আহত হয়েছেন, তাদের জীবন প্রদীপ হয়তো এখনও নিভে যায়নি। কিন্তু সেই মানুষগুলোকে উদ্ধারের নামে তাদের লাশ গুম করার মেকানিজম করেছিল এই অঞ্চলের আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান। সোহেল রানারা বাংলাদেশে রানা প্লাজার মতো ঘটনা ঘটিয়ে হত্যার মহোৎসব করেছিল। আওয়ামী লীগের শাসনামলে, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সুবিধা নিয়ে সেই রাজনীতির যাঁতাকলে মানুষকে পিষ্ট করে শুধু শ্রমিকরাই হতাহত হননি—সারা দেশের মানুষকেও বিভিন্ন সময়ে জীবন দিতে হয়েছে। শিক্ষা অর্জন করে সরকারি চাকরি করে চলবে, পরিবারের ভরণপোষণ চলবে—এই সক্ষমতা অধিকাংশ মানুষের নেই। বেশিরভাগ মানুষ খেটে খাওয়া ও শ্রমিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা সেই শ্রমিকরা নিরাপদে কর্মস্থলে থাকবেন—এই নিশ্চয়তাটুকু আমাদের সরকার এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারে নাই।’
তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজার শ্রমিকদের যে জীবন দিতে হয়েছে, এর পেছনে সবচেয়ে দায়ী হলো সোহেল রানার রাজনৈতিক ক্ষমতা। আওয়ামী লীগ সরকার রাজনীতিকে এমনভাবে দুর্বৃত্তায়িত করেছিল যে, সেই ফাঁদে পড়ে দেশের শ্রমিকদের রানা প্লাজায় জীবন দিতে হয়েছে। যদি রানা প্লাজার রানার কাছে আওয়ামী ক্ষমতা কুক্ষিগত না থাকতো, তাহলে সেদিন আমাদের শ্রমিক ভাইদের জীবন দিতে হতো না। দুর্ঘটনার পর যখন বিদেশি সংস্থাগুলো উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি চাইলো, শেখ হাসিনার সরকার বিদেশি সংস্থাগুলোকে এখানে উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে বাধা দিলো। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার যে দুর্বৃত্তায়ন করেছিল, রানা প্লাজার ঘটনায় সেই দুর্বৃত্তায়নের কথা যেন আন্তর্জাতিক মহলে না যায়—সেটি ধামাচাপা দিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এখানে উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে দেয়নি তারা। এ অবস্থায় পতিত স্বৈরাচারের মতো নয়, রানা প্লাজার ঘটনায় যে মামলাগুলো পড়ে আছে, সেগুলোর বিচার নতুন গতিতে, নতুন উদ্যোগে, অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেবে অন্তর্বর্তী সরকার—এটাই আমাদের দাবি।’
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় এক হাজার ১৩৫ জন নিহত এবং এক হাজার ১৬৯ জন গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গু হন।