বগুড়ায় এক ব্যবসায়ীর ফেলে যাওয়া ২৫ লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ১৮ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ১৫ হাজার টাকা ফিরিয়ে দিয়ে সততা দেখিয়েছেন, অটোরিকশা চালক ও কলেজ ছাত্র খায়রুল ইসলাম খোকন (২৫)। শুক্রবার রাতে সদর থানায় মালিকের কাছে এই টাকা ও স্বর্ণ ফিরিয়ে দিয়েছেন।
শাজাহানপুর থানার এসআই আবদুল কুদ্দুস জানান, তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। শিগগিরই পুলিশ সুপার তাকে সততার পুরস্কার দেবেন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, পাবনার ফরিদপুর উপজেলার উত্তর গোপালনগর এলাকার শফিউর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ শাহিন জুয়েলারি ব্যবসায়ী। তিনি ঈদের দুদিন আগে গত ২৯ মার্চ বিকালে কেনাকাটা করার জন্য বগুড়া শহরে আসেন। তিনি শহরের নিউ মার্কেট থেকে ২৫ লক্ষাধিক টাকা মূল্যে ১৮ ভরি বিভিন্ন ডিজাইনের স্বর্ণালংকার কিনে একটি কালো ব্যাগে তোলেন। এ ছাড়া ঈদের কিছু কেনাকাটা করেন। এরপর তিনি বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য শহরের সাতমাথায় এসে বনানীগামী সিএনজি অটোরিকশায় ওঠেন। এ সময় তার হাতে তিনটি ব্যাগ ছিল। বিকাল ৫টা ৫৮ মিনিটের দিকে বনানী পৌঁছার পর পাবনাগামী নবীনবরণ বাস দেখতে পান। তিনি দ্রুত অটোরিকশা থেকে নেমে দুটি ব্যাগ নিয়ে বাসে ওঠেন। বাস ছাড়ার পর টের পান ১৮ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ১৫ হাজার টাকা থাকা ব্যাগটি অটোরিকশায় রয়ে গেছে। এরপর তিনি বাস থেকে নেমে অটোরিকশা ও এর চালককে খোঁজাখুঁজি করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে সদর থানায় গেলে তাকে ঘটনাস্থল শাজাহানপুর থানায় জিডি করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে তিনি শাজাহানপুর থানায় জিডি করেন। গহনা ও টাকা হারিয়ে ব্যবসায়ী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
শাজাহানপুর থানার এসআই আবদুল কুদ্দুস জানান, জিডি হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি অটোরিকশা ও এর চালককে শনাক্ত করতে সোর্স নিয়োগ এবং বিভিন্ন এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেন। এক পর্যায়ে শহরের কানুচগাড়ি এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে অটোরিকশাটি শনাক্ত করলেও শুধু চালকের নীল গেঞ্জি দেখতে পাওয়া যায়। এরপর ওই ছবি অন্য অটোরিকশা চালকদের দেখালে তারা বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বেতগাড়ি হাজিপাড়ার মৃত রঞ্জু মিয়ার ছেলে ও বগুড়া সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজের অনার্স (ব্যবস্থাপনা) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র খায়রুল ইসলাম খোকনকে শনাক্ত করেন।
এসআই আবদুল কুদ্দুস আরও জানান, অটোরিকশায় ব্যাগ পাওয়ার পর চালক ও কলেজছাত্র খায়রুল ইসলাম খোকন শহরের সাতমাথা, বনানীসহ বিভিন্ন স্থানে ওই ব্যবসায়ীর খোঁজ করেন। ঘটনাটি প্রকাশ করলে যে-কেউ এত মূল্যবান জিনিস নিয়ে নিতে পারে। তাই তিনি তার পরিচিত বগুড়া ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট আলমগীর হোসেনকে অবহিত করেন। তখন ছুটিতে থাকা ওই সার্জেন্ট জানান, তিনি ফিরে এসে এ ব্যাগের মালিককে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
এদিকে, অটোরিকশা চালককে শনাক্ত করার পর শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ফোন দিলে খোকন জানায়, এক যাত্রী স্বর্ণালংকার ও টাকাসহ একটি ব্যাগ তার অটোরিকশায় ফেলে গেছেন। তিনি ব্যাগের মালিককে কয়েকদিন ধরে খোঁজাখুঁজি করছেন। এরপর তিনি ট্রাফিক সার্জেন্ট আলমগীর হোসেনকে ফোন দিয়ে অবহিত করার পর ওই ব্যাগ নিয়ে সদর থানায় আসেন। রাত ১১টার দিকে পুলিশ কর্মকর্তারা জুয়েলারি ব্যবসায়ী শাহিনের হাতে স্বর্ণালংকার ও টাকার ব্যাগটি হস্তান্তর করেন। তাৎক্ষণিকভাবে ওই ব্যবসায়ী ও পুলিশ কর্মকর্তা অটোচালক খোকনকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন। আগামী ৭ এপ্রিল জেলা পুলিশের একটি অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার তাকে সততার জন্য পুরস্কৃত করবেন।
সততার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী অটোরিকশা চালক ও কলেজছাত্র খায়রুল ইসলাম খোকন জানান, তিনি অটোরিকশা চালিয়ে নিজের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ মেটান। গত ২৯ মার্চ ইফতারের আগে বনানী এলাকায় এক রিজার্ভ যাত্রী নেমে যাওয়ার পর তিনি পেছনের সিটে কালো রঙের ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন। ব্যাগ খুলে দেখেন ভেতরে অনেক স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন স্থানে ওই যাত্রীর খোঁজ করতে থাকেন। সন্ধান না পাওয়ায় বিষয়টি পরিচিত ট্রাফিক সার্জেন্ট আলমগীর হোসেনকে অবহিত করেন। তিনি ছুটি থেকে ফিরে এসে এ ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তিনি আরও জানান, বাড়িতে ফিরে মাকে ঘটনাটি বলেন। মা তাকে দ্রæত ব্যাগটি মালিককে ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দেন। ওই ব্যাগে কত টাকা ও গহনা ছিল সেটা বড় কথা নয়; অন্যের আমানত ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন এটাই তার কাছে বড় এবং গৌরবের।