X
শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫
২২ চৈত্র ১৪৩১

প্রিয় শিক্ষার্থীরা, দয়া করে মব জাস্টিস করবেন না

জোবাইদা নাসরীন
২২ আগস্ট ২০২৪, ২২:২৯আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৪, ২২:২৯

৫ আগস্ট অসাধারণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা শেখ হাসিনা সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। ৯০-এর আন্দোলনের ৩৪ বছর পর এ দেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে আরও একটি গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। যদিও এই অভ্যুত্থানে প্রাণ ঝরেছে অনেক বেশি। বিশেষ করে জেন-জেডকে যারা মনে করতো খুবই স্বার্থকেন্দ্রিক, ট্যাব বা মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকা আরেক প্রজন্ম, তারা সবাইকে ভ্রান্ত প্রমাণিত করে নতুন এক স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আমরা গর্বিত তোমাদের সাহস এবং স্পর্ধিত তারুণ্যে।

সেই তারুণ্যের ডাকে সবাই এক হয়েছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চলে গেছে দুই সপ্তাহের অধিক। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হলো এখনও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং কোথাও কোথাও বেশ নাজুক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। চলছে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের হিড়িক। অন্যদিকে জোর করে পদত্যাগ এবং বিভিন্ন পদে থাকা, ভিন্ন মতের এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নাজেহাল, হেনস্তাও বাড়ছে। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেগতিক। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন বলতে কিছুই নেই। ‘অভিভাবকহীন’ভাবেই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর পাশাপাশি জোর কদমে চলছে শিক্ষার্থীদের মব জাস্টিস। যে শিক্ষার্থীরা আমাদের ‘হীরা’, আমাদের সোনার সন্তান, তারা কেন এই মব জাস্টিস করবে? তাদের এই আচরণে কেন অন্যরা তাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে?

অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা খুব বেশি জানি না, তবে বিভিন্ন জায়গায় কলেজ অধ্যক্ষদের শিক্ষার্থীরা জোর করে হুমকি দিয়ে পদত্যাগ করাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরও খারাপ। এখানে প্রতিদিনই একে ওকে পাকড়াও করছে, ঘেরাও করছে, হৈ হৈ করে একে-ওকে ধরছে, পদত্যাগে বাধ্য করাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পদত্যাগের দাবিতে মিছিল, অপমান, হেনস্তা, বিভাগ বয়কট, সবই চলছে। এর পাশাপাশি মব নিয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বাসায় গিয়ে ঘেরাও করছে, দরজা ভেঙে ঢুকার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন জনের নামে পোস্টার বানিয়ে টানিয়ে দিচ্ছে এখানে-ওখানে। বিভিন্ন শিক্ষক আতঙ্কে আছেন। এগুলো কোনোটিই একেবারেই কাঙ্ক্ষিত নয়। এবং ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ভয়ংকর এক ক্ষতির দিকে রূপ নিচ্ছে।

তবে এটাও নিঃসন্দেহে বলা যায় যে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের এই ভয়াবহ ‘বাজে’ সম্পর্কের ভিত্তি শুধু এই আন্দোলন নয়। ছাত্র-শিক্ষক ক্ষমতার পাশাপাশি যখন থেকে শিক্ষকরা জাতীয় রাজনৈতিক দলের লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতিতে নিজেদের সমর্পণ করলেন তখন থেকেই এই সম্পর্কের ফারাক শুরু। ক্ষমতাসীন দল আর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতারাই চালাতো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উপাচার্যদের ঘিরে থাকতো নেতারা। শিক্ষকরা মুখ বেজার করে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতো। অনেক ছাত্রনেতাকে দিয়ে আবার কোনও কোনও শিক্ষক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য হওয়ার তদবির করাতেন। যার কারণে এই ছাত্রনেতারা যখন আবাসিক হলগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর ওপর নিপীড়ন করতেন তখন শিক্ষকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চুপ থাকতেন। কারণ দুটো–

এক: ছাত্রনেতাদের বিপক্ষে কথা বললে জীবন বিপন্ন হতে পারে, আবার অন্যদিকে তাদের ভবিষ্যৎ পদ-পদবির স্বপ্ন মুছে যেতে পারে। আর এভাবে প্রশ্নাতীতভাবেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী থেকেছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের ছাত্রনেতারা এবং তাদের চর্চিত ক্ষমতা। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে যখন ছাত্রলীগ দিয়ে দমন, পীড়ন চালানো হতো, তখনও নীরব থাকতো প্রশাসন এবং কখনও কখনও প্রশাসনের নির্দেশেই সেটি করানো হতো। এছাড়া গেস্টরুম, গণরুমের নির্যাতনের শিকার হয়ে কোনও ধরনের বিচার পাননি শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা সব মনে রেখেছে। কারণ তাদের জীবনের ভয়ংকর ট্রমা তৈরি করছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা। তারা বিচার চেয়ে বিচার পাননি। বরং বিচার চাওয়ায় উল্টো নেমে এসেছিল বাড়তি নিপীড়ন।

এর বিপরীতে তাই এখন তারা এই মবোক্র্যাসি চালাচ্ছে। কিন্তু এটিও তাদের বুঝতে হবে এই ধরনের প্রবণতা এবং চর্চা তাদের বিপক্ষে যাচ্ছে। এখন যেখান সেখানে এক অপরকে হুমকি দিয়ে বলছে, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে ছাত্র নিয়ে আসবো’।

প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আপনারা যেভাবে বারবার বাংলাদেশকে গর্বিত করেছেন, গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছেন, এই মবোক্র্যাসির চর্চা সেই আপনাদের সঙ্গে যায় না। এ দেশের মানুষ আপনাদের ভালোবাসে, আপনাদের ওপর নির্ভর করতে চায়। কিন্তু তার বিপরীতে আপনারা যদি ভয় দেখানোর প্রতিভূ হয়ে ওঠেন, তাহলে সেই তো ভয়ের সংস্কৃতি থেকেই যাচ্ছে। আমরা আর মুক্তি পেলাম কই?

আরও মনে রাখতে হবে যে আপনাদের স্পর্ধিত সাহসের ওপর ভর করে কেউ যেন কারও ব্যক্তিগত ফায়দা না নিতে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকরা আছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সরকারের আমলে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকরা বিএনপি এবং জামাতপন্থি শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি এবং কোণঠাসা করেছে। তারা কিন্তু অনেক সময় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেই বিরোধী মতকে দমন করেছে এবং বিভিন্ন শিক্ষককে অপমান করেছেন। এখন সেভাবেই এক পক্ষ চাইতে পারে আপনাদের ব্যবহার করেই ব্যক্তিগত বা দলবদ্ধভাবে অন্যকে হেনস্তা করতে। আমরা সেগুলোর যেমন প্রতিবাদ করেছি, এগুলোরও করবো। আপনাদের প্রতি হেনস্তা, অপমান, হুমকি যেসব শিক্ষক কিংবা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট যারা করেছেন, আপনারা নিশ্চিতভাবেই  সেগুলোর বিচার চাইবেন।  আমি মনে করি সেগুলোর বিচার হওয়াটা জরুরিও। কিন্তু নিজেরাই যদি মব জাস্টিস করেন তাহলে তো আপনারা অন্যদের কাছ থেকেও সমর্থন হারাতে পারেন। কারণ ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়াই মত প্রকাশের স্বাধীনতার মূল শর্ত।

স্পষ্টই বলছি, এই মব জাস্টিসকে স্বাগত বা আশকারা দেওয়ার সুযোগ একেবারেই কম। তাই এটি বেশি দিন জারি থাকলে আপনাদের প্রতি জনগণের যে ভালোবাসা, সম্মান এবং আস্থার জোয়ার তৈরি হয়েছিল নিশ্চিতভাবেই সেটিতে ভাটা পড়বে। আমাদের মনে রাখতে হবে, যখন কোনও দেশেই এরকম একটি ক্রান্তিকাল চলে তখন যে যার মতো সেটির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। আশা করি আপনারা কোনোভাবেই সেই সুযোগের পুঁজি হবেন না।

অন্যদিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘অভিভাবকহীন’ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুব দ্রুতই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপক অস্থিরতা হচ্ছে। সেটি নিরসনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে। মব জাস্টিসের চর্চা বন্ধ করতে হবে।

দেশের বন্যা পরিস্থিতি খুব খারাপ। কয়েকটি জেলা তলিয়ে যাচ্ছে প্রায়। শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ, প্রতিশোধের রাজনীতিতে সময় এবং মেধা নষ্ট না করে মানুষের পাশে দাঁড়ান। ইতোমধ্যে আপনারা কাজ শুরু করেছেন, আমরা আপনাদের কাছে থেকে সবসময় এই মানবিকবোধেরও উত্তাপ নিতে চাই।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইমেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মীরসরাইয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ প্রাণ গেলো ২ জনের
মীরসরাইয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ প্রাণ গেলো ২ জনের
সুনামগঞ্জে পুলিশের বিশেষ অভিযানে আ.লীগ-যুবলীগের দুই নেতা গ্রেফতার
সুনামগঞ্জে পুলিশের বিশেষ অভিযানে আ.লীগ-যুবলীগের দুই নেতা গ্রেফতার
রুশ হামলায় জেলেনস্কির শহরে শিশুসহ নিহত ১৯
রুশ হামলায় জেলেনস্কির শহরে শিশুসহ নিহত ১৯
খরায় পুড়ছে চা বাগান, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
খরায় পুড়ছে চা বাগান, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
সর্বশেষসর্বাধিক