উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের ধান আবাদে বরেন্দ্র অঞ্চল রাজশাহীতে বিপ্লব হয়েছে। গত কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় কম ফলনশীল স্থানীয় জাতগুলোর ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে কৃষি বিভাগ। এতে এ অঞ্চলে একদিকে যেমন খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্তের ধারাবাহিকতা রক্ষা হচ্ছে, তেমনি অধিক ফলন পেয়ে লাভবান হচ্ছেন কৃষক।
জানা গেছে, ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশ থেকে আগত ও দেশীয় উদ্ভাবনের উচ্চফলনশীল উফশী আবাদে কৃষকদের আগ্রহ কয়েক দশক থেকে বেড়েছে। বর্তমানে বোরো, রোপা ও আমন মৌসুমে সারা বাংলাদেশের ৭৬ শতাংশ জমিতে উফশী জাতের ধানের আবাদ হচ্ছে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৯১ শতাংশই উফশী থেকে আসছে। কম উৎপাদনশীল স্থানীয় জাতের আবাদ রাজশাহী অঞ্চলে কমেছে। বোরোতে স্থানীয় জাতের ব্যবহার একেবারেই নেই বললেই চলে। এছাড়া অন্যান্য মৌসুমে কিছু জমিতে স্থানীয় জাতের আবাদ হচ্ছে। যেটা সময়ের সঙ্গে কমে আসবে বলে ধারণা করছেন কৃষিবিদরা।
রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, রাজশাহী অঞ্চলে বর্তমান বোরো মৌসুমে ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এরমধ্যে হাইব্রিড জাত রয়েছে ২৩ হাজার ৭৮০ হেক্টর, উফশীতে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাত মাত্র ১২০ হেক্টর জমি। স্থানীয় এই ১২০ হেক্টর আবাদ পুরোটায় নাটোর জেলায় আবাদ করা হচ্ছে। অন্যান্য জেলায় স্থানীয় জাতের ব্যবহার শূন্যের কোঠায়। এছাড়া আউশ ও রোপা মৌসুমেও স্থানীয় জাতের ব্যবহার বোরো মৌসুমের চেয়ে কিছুটা বেশি। তবে স্থানীয় জাতের উৎপাদন কম হওয়ায় আউশ ও রোপা মৌসুমেও আবাদ কমে আসবে বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা।
বর্তমানে রাজশাহীতে বোরো আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। গত বছর ধানের ভালো দাম পেয়ে এবং এখনও দাম ভালো থাকায় উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গেই বোরো আবাদে নেমেছেন। কৃষকরা বলছেন, আবহাওয়া ভালো থাকলে এবং ধানের নায্যমূল্যে পেলে এবারও লাভবান হবেন তারা। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার ২৬৫ হেক্টর। যেখানে উফশী জাতের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ৬১ হাজার ১৫৫ হেক্টর, হাইব্রিড ৫ হাজার ১১০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের আবাদ শূন্য।
রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক আতর আলী জানান, তিনি এবার প্রায় দেড় বিঘার মতো জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। তিনি এবার উচ্চফলনশীল উফশী জাত লাগিয়েছেন। গত ৫ বছর আগেও তিনি স্থানীয় জাতের ধান লাগাতেন। যেগুলোতে তেমন ফলন পেতেন না। এরপর থেকে অন্যান্য কৃষকদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি উফশী আবাদ করছেন। এবং ভালো ফলনও পাচ্ছেন।
আরেক কৃষক রিয়াজুল ইসলাম জানান, গত বোরো মৌসুমে উফশী আবাদে ভালো ফলনের সঙ্গে ভালো দামও পেয়েছেন। এবারও প্রায় একবিঘা মতো জমিতে বোর আবাদ করেছেন। এবার আবহাওয়া ভালো থাকলে ও দাম পেলে লাভবান হবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, বিগত কয়েক দশক থেকেই রাজশাহী অঞ্চলে উফশী জাতের আবাদ বাড়ছে। মোট উৎপাদনের বড় একটি অংশই আসছে উফশী থেকে। উফশী মানেরই উচ্চফলনশীল। সুতরাং দেশের খাদ্য চাহিদা মেটানোর তাগিদেই উফশীর ব্যবহার বেড়েছে।
তিনি আরও জানান, রাজশাহী অঞ্চলে উফশী জাতের ব্যবহার বাড়ছে এবং আগামীতেও হয়তো বাড়বে। কিন্তু স্থানীয় জাতগুলোও একেবারে হারিয়ে যাবে না।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পার্থ সরথী বিশ্বাস জানান, বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই অল্প স্বল্পভাবে উচ্চফলনশীল উফশী জাতের আবাদ হয়ে আসছে। যেটা এখন অনেক বেড়েছে। বর্তমানে বোরো, রোপা ও আমন মৌসুমে সারা বাংলাদেশের ৭৬ শতাংশ জমিতে উফশী জাতের ধানের আবাদ হচ্ছে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৯১ শতাংশই উফশী থেকে আসে। এটা বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে।