সেকশনস

নারীবাদে নারী বাদ!

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৯, ১৭:৪৮

শেগুফতা শারমিন দিন কয়েক আগে যাওয়া পড়েছিল পদ্মা পাড়ের এক মাছের আড়তে। মধ্যত্রিশের যুবক আড়তদার। মাছের নিলাম ডাকছে আর খিস্তি করছে। সে যে কী খিস্তি! নিজের কান বন্ধ করার ঢাকনা কেন নেই, এই যন্ত্রণায় ভুগি। কত তাড়াতাড়ি এই খিস্তির নরক পার হওয়া যায় সেই পথ খুঁজি। পড়ি কী মরি দৌড়ের ভেতর নাকমুখ চেপে সহযাত্রী বলে ওঠে, ‘ ইশ একেবারে নারীবাদীদের মতো মুখ খারাপ!’ চকিতে আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করে ওঠে। আরে! নারী মুক্তি, নারীর অধিকার, নারীর সংগ্রাম, নারীর সাফল্য সবকিছু ছাপিয়ে এক মাছ বাজারের আড়তদারের খিস্তিখেউড়ের সঙ্গে তুলনায় এলো নারীবাদ! হায় ঈশ্বর!
স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরে এসে এ দেশে নারী যতটুকু এগিয়েছে বা এগোয়নি, তার পেছনের গল্প অনেক, ত্যাগ অনেক। তারচেয়ে আরও বেশি কষ্ট এবং ধৈর্য। একদিন ঘর থেকে বের হওয়াটাই যে নারীর জন্য ছিল কঠিনতম ব্যাপার, সেই নারী এখন শিক্ষায় পুরুষের চেয়ে এগিয়ে। একদম শুরুতে বড়জোর স্কুলশিক্ষক অথবা পরিবার পরিকল্পনাকর্মী হিসেবে পেশাদারিত্বে আসা নারী এখন কোন পেশায় নেই? নারীর পেশা নিয়ে স্টেরিওটাইপ চিন্তা ভেঙেছেন নারীরাই। পুরুষের সমান বা পুরুষের চেয়ে বেশি উপার্জন করে নারীই পুরুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে কর্মক্ষেত্র শুধু পুরুষের একার নয়। আবার সংসার মানেই শুধু একজনের আয় আর আরেকজনের ঘর সামলানো নয়। সেই কবে এই দেশের মেয়ে বিমান চালানো শুরু করেছে। এখন তো যুদ্ধবিমানও চালাচ্ছে নারী। অথচ একসময় সাইকেল বা মোটরসাইকেল চালানো শুরু করতে নারীকে বহু যুদ্ধ করতে হয়েছে। এসব শোনা গল্প, যারা আমাদের চেয়ে দুই বা তিন প্রজন্ম আগে সমাজ বদলের কাজ করে গেছেন, সেই সব নারীর কাছেই। তাদের এসব সংগ্রামের গল্পকে যেন কষে আঘাত করে মাছের আড়তে বলা সহযাত্রীর বাণী।

চোখে ভাসে রোজ বিকেলে মহাখালী বা ফার্মগেট বা যেকোনও রাস্তার মোড়ে  রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে বাসের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা অফিস ক্লান্ত অচেনা নারীর মুখ। যে নারীও নারীর এগিয়ে যাওয়ায় নীরবে ভূমিকা রাখে। মনে পড়ে কুড়িগ্রামের কোনও এক গ্রামে বাঁধের ঢালে ঘর বেঁধে বসবাস করা চার সন্তানের মা আর্জিনার কথা। স্বামী যার কাজের খোঁজে জেলান্তরী। ঘরে যার খাবার নেই। সেও  সংগ্রাম করে, প্রত্যেকটা দিন পার করে তার সংজ্ঞায় মর্যাদার সঙ্গে। নারীর এগিয়ে যাওয়া মানে আর্জিনার সংগ্রামও। নারীর সম্মান মানে আর্জিনার সম্ভ্রমবোধও। অথবা খুব পরিচিত উদাহরণ দিতে গেলে আমার শিক্ষক রুমানা মনজুর। যার দ্বিতীয় জীবন পেয়ে বেঁচে থাকার গল্প নিয়ে নতুন করে এখানে বলার কিছু নেই। এদের কারোরই সংগ্রামে, নারীত্বে, নারীবাদীতে খিস্তিখেউর নেউ। তবু কেন কেউ আড়তদারের মুখের গালিতে নারীবাদ খুঁজে পায়?

নারী হিসেবে এই পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে লজ্জার। অপমানের। একই সঙ্গে ভাবারও বটে। নারীকে কখনও আলাদা করে, ছোট করে ভাবতে শিখিনি। জানি, হাজারো বাধা আছে, বিপত্তি আছে, তারপরও নারীকে মূলধারা হিসেবেই দেখতে, ভাবতে অভ্যস্ত। সারা জীবন যত প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে, সব জায়গায় সবার সঙ্গেই প্রতিযোগিতা হয়েছে। শুধু নারীর জন্য নির্দিষ্ট অংশে নামতে হয়নি। জীবনে জয় বা সাফল্য যেটুকু এসেছে অন্য অনেক মানুষকে পেছনে ফেলেই তা এসেছে। নারীকে না পুরুষকে তা আলাদাভাবে ভাবারও দরকার হয়নি। মূলধারায় টিকে থাকার মন্ত্র এটাই।  মূলধারায় সফলতা মানে শুধু ভাবিদের দলে শাড়ি চুড়ির গল্প নয়, স্বামীর আয় রোজগারের বড়াই নয়। মূলধারা মানে ফ্যাশনের আলাপও হবে আবার ভাবিদের স্বামীদের চেয়ে পেশায় এগিয়ে থাকা, উপার্জনে এগিয়ে থাকা নারী অন্যকে সাহস জোগাবে, প্রেরণা জাগাবে। নারী বলে শুধু নারীদের কথাই বলতে হবে, নারীত্ব নিয়েই কেবল ভেবে চলবে, তাই বা কেমন এগিয়ে যাওয়া? 

নারী বরং সবকিছুতে অংশ নেবে। নারী রাজনীতি নিয়ে কথা বলবে, নারী দর্শন নিয়ে কথা বলবে, ধর্মই বা কেন শুধু পুরুষের বিষয় থাকবে? রকেট সায়েন্স থেকে মাছের রেসিপি সবকিছুতেই নারীর অংশগ্রহণ প্রমাণ করবে নারী কতটা যোগ্য। নারীকে সমীহ করা হবে নারীর মেধায়, নারীর ক্ষমতায়। ক্ষমতায়ন মানে নারীর আর্থিক স্বাবলম্বিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাবলম্বিতা। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর স্বাধীনতা, নারীর অধিকার সবক’টি বিষয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একটু বোঝার তারতম্যে, বোঝানোর চেষ্টার কৌশলের একটু উনিশ-বিশে পুরো বিষয়টাই হতে পারে বিতর্কিত। এতে ক্ষতি নারীরই। ক্ষতি এত বছর ধরে চলমান নীরব সংগ্রামের। একটা ভুল পদক্ষেপ, আরও অনেক নারীর হাঁটার চেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। এমনিতেই নারীকে হেয় করার নানাবিধ উপাদান চারদিকে এন্তার ছড়ানো। তার ভেতরে খুব সচেতনভাবে লক্ষ রাখতে হবে যেন নারীর ভালো করতে গিয়ে এসব নেতিবাচক উপাদান বাড়ানো না হয়ে যায়। নিজের কাজে বা কথায় নারীর উপকার না হোক, ক্ষতি যেন না হয়। নারীবাদকে মাছের আড়তের খিস্তির সাথে তুলনীয় করে, নারী অধিকারকে বক্র চোখে দেখার জায়গায় নিয়ে যাওয়াতে আর্জিনা বা রুমানা মনজুর বা কোনও অফিসের যেকোনও ডাকসাইটে কর্তা অথবা দুপুরে ফুলতোলা বিছানায় ভাতঘুমে যাওয়া নারী কারও কোনও লাভ নেই। কোনও জিতে যাওয়া নেই। বরং দীর্ঘদিন ধরে আকৃতি পেয়ে আসা অধিকারের জায়গাটাকে সমালোচিত করার সুযোগ দেওয়া হয়।

নারী অধিকার মানে রাষ্ট্রীয় মৌলিক অধিকার, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, সিডও সনদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। কোনও কিছুকে লঘু করা না। ভুল ব্যাখ্যার প্রচার না। নারীর শরীরের অধিকার মানে, নিজের শরীরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। তার সুস্বাস্থ্য, তার সুস্থ স্বাভাবিক প্রজনন স্বাস্থ্য। শরীর বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। শরীর প্রদর্শন বা অনিয়ন্ত্রিত বেসিক ইনস্টিংকটের সঙ্গে অধিকার গুলিয়ে ফেললে নারীর জন্যই সমস্যা। বেসিক ইনস্টিংকট নিয়ন্ত্রণ করা না করার সঙ্গে মানুষের শিক্ষা, রুচি, জীবনবোধ জড়িত। এই রুচি একেকজনের একেক রকম। সবার জন্য যেটা কাম্য, সবার জন্য যা প্রযোজ্য তা-ই অধিকার। রুচিভেদে, শিক্ষাভেদে যেসব প্রয়োজনের তারতম্য ঘটে, সেসব গড়পরতা অধিকারের কাতারে পড়ে না। সুতরাং অধিকারের তকমা দিয়ে যেসব ব্যক্তিগত রুচি বা ইচ্ছার প্রচারণারও দরকার পড়ে না, প্রচারণার দরকার পড়ে না নারীর পোশাকের ময়নাতদন্তও।  পোশাক পরার স্টাইলও একেকজনের একেক রকম। যার কাছে যেটা ভালো, সে সেভাবেই পরবে। একজনের স্টাইল আরেকজন নেবে কী নেবে না সেটা তার ব্যাপার। আর তার চেয়েও বড় কথা অধিকারের মৌলিক বাস্তবায়নে পোশাকের কোনও ভূমিকা নেই ।

আরব নারীর বোরকাই হোক বা ল্যাটিন আমেরিকার টপলেস; নারীর শিক্ষা, চিকিৎসা বা খাদ্যের সুষম বণ্টনের অধিকারের সঙ্গে  বড়ভাবে সাংঘর্ষিক না। অঞ্চল বা পরিবেশভেদে পোশাক তাদের ভিন্ন। কিন্তু পীড়নের গল্প সব দেশে সব নারীরই প্রায় সমান।  যে কারণে, গাইবান্ধার চরে বসেও যেই নারীর নিপীড়নের যে গল্প শুনেছি, দক্ষিণ হল্যান্ডের শহরতলির এক গির্জায় বসেও একই নির্যাতনের গল্প শুনেছি ডাচ নারীর মুখে।  স্বামীর বাধায় এনজিওর মাঠকর্মীর চাকরি ছেড়ে  দেওয়ার কথা শুনেছি পাথরঘাটার কুলসুমের। আবার কেবল স্বামী চায় না বলে সাউথ এশিয়ায় একটি সংস্থাপ্রধানের পদ ছেড়ে দেশে ফিরে মাঝারি গোছের চাকরিতে যোগ দিতে দেখেছি  একজন ইউরোপিয়ান নারীকে। চারদিকে এমন শত শত হাজার হাজার নারীর গল্প নিয়েই নারী জীবন। সবাই একসঙ্গে বেঁচে থাকার নাম সংগ্রাম। একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার নাম বিপ্লব।

কোনও একজনের ইচ্ছা অনিচ্ছা রুচিবোধ বা জীবনবোধ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মানে নারীকে পেছনে টেনে ধরা।  যেটা খারাপ, যেটা অরুচিকর, যেটা অন্যায় বলে স্বীকৃত, সেটাকে কৌশল হিসেবে নেওয়া মানে নারীকে হেয় করা। মাছের আড়তের প্রচলিত গালি যেমন আড়তদারের মুখে শুনতে খারাপ লাগে, মনে হয় ধরনি দ্বিধা হও। তেমনভাবে নারীর অগ্রযাত্রার মাপকাঠি হিসেবে এসব খিস্তিখেউড়ের ব্যবহার দেখলে কেবলই করুণা হয়। নারীর জন্য, মানবের জন্য, কল্যাণের জন্য।  

লেখক: উন্নয়নকর্মী

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

দুই কাউন্সিলর প্রার্থীকে জরিমানা

দুই কাউন্সিলর প্রার্থীকে জরিমানা

আশুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই নিহত: ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা

আশুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই নিহত: ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা

বরগুনার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আলাদা নজর আছে: নানক

বরগুনার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আলাদা নজর আছে: নানক

২৬ জানুয়ারি মধ্যরাত থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

২৬ জানুয়ারি মধ্যরাত থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

দেশের প্রথম ডিজিটাল ভূমি তথ্য ব্যাংকের উদ্বোধন আজ

দেশের প্রথম ডিজিটাল ভূমি তথ্য ব্যাংকের উদ্বোধন আজ

‘বিএনপি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নানা চক্রান্ত করছে’

‘বিএনপি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নানা চক্রান্ত করছে’

ভারতের পদ্মশ্রী খেতাব প্রসঙ্গে যা বললেন সন্‌জীদা খাতুন

ভারতের পদ্মশ্রী খেতাব প্রসঙ্গে যা বললেন সন্‌জীদা খাতুন

মোংলায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালবাহী জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার

মোংলায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালবাহী জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার

সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে জাপার বিশেষ কমিটি

সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে জাপার বিশেষ কমিটি

লন্ডন থেকে সিলেটে আসা ২৮ যাত্রীর করোনা পজিটিভ

লন্ডন থেকে সিলেটে আসা ২৮ যাত্রীর করোনা পজিটিভ

বেঁচে গেছেন তরুণী কিন্তু…

বেঁচে গেছেন তরুণী কিন্তু…

প্রধানমন্ত্রী টিকা নিলে জনগণের আস্থা তৈরি হতে পারে: মির্জা ফখরুল

প্রধানমন্ত্রী টিকা নিলে জনগণের আস্থা তৈরি হতে পারে: মির্জা ফখরুল

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.