X

সেকশনস

‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ ও আমাদের বোঝাবুঝি

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:০৬

জোবাইদা নাসরীন ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা টি-শার্টের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়ার পর তা আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অনলাইনভিত্তিক ফ্যাশন হাউজ ‘বিজেন্স’র টি-শার্টে তুলে এনেছেন যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে এ প্রতিবাদের ভাষা। গত বছর প্রথমবারের মতো খোঁপার কাঁটায় স্থান পায় ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ স্লোগানটি। এটি লিখে গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তারা। এবার একই স্লোগান নিয়ে এলো টি-শার্ট। এর আগেও মেয়েদের অনলাইনভিত্তিক গ্রুপ ‘মেয়ে’র পক্ষ থেকে রিকশার পেছনে, মোবাইল কেসের পেছনে নানা ধরনের যৌন-নিপীড়নবিরোধী বক্তব্য লিখে প্রচারণা হয়েছিল।
সম্প্রতি ফেসবুকে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ এই লেখনী সম্বলিত টি-শার্ট নিয়ে নানা ধরনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, মন্তব্য, হাজির হয়েছে। এনিয়ে ট্রল করে লেখাও হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন অভিনব এই ক্যাম্পেইনে নিপীড়কদের সতর্ক করা হয়েছে। আবার কেউ পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন, ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ প্রতিবাদটাকে কেন জেনারেলাইজ করা হয়েছে। এতে আবার নারীর জন্য ভিন্ন পরিবহন, ভিন্ন পরিসরের চিন্তা অনেকের মধ্যে আসতে পারে। এবং এটাও ঠিক, যৌন হয়রানির শিকার নারী-পুরুষ উভয়েই হতে পারেন। ফেসবুকে দু’চারজন পুরুষও গণপরিবহনে তাদের যৌন হয়রানির বর্ণনা দিয়েছেন। ঢাকা শহরের গণপরিবহনগুলোতে গা ঘেঁষে না দাঁড়িয়ে উপায় নেই হয়তো। কিন্তু আমি যতটুকু বুঝি ‘খারাপ স্পর্শ’ এবং ‘অনিচ্ছাকৃত’ স্পর্শের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। নারী, পুরুষ কিংবা অন্যান্য লিঙ্গীয় বৈচিত্র্যের সবাই এই পার্থক্য বোঝেন। সেটি নারীর প্রতি হোক আর পুরুষের প্রতি হোক। একজন ছোট্ট ছেলে-মেয়েও বোঝে এই পার্থক্যটুকু। তাই এই স্লোগান কাদের জন্য সেটি আর খোলাসা করে বলার দরকারও নেই। বরং এটি নিয়ে ট্রল করা এবং ভিন্ন তর্ক পাড়ার তাড়না এর উদ্দেশ্যকে খারিজ করা ছাড়া আর কিছু নয়।

২০১৭ সালে প্রকাশিত ব্র্যাকের করা ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, দেশের গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্য কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারাই নারীদের বেশিরভাগ যৌন হয়রানির শিকার হন, এই হার ৬৬ শতাংশ। সেই গবেষণার গণপরিবহন ব্যবহারকারী ৪১৫ উত্তরদাতার মধ্যে ৩৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ১৯-২৫ বছর বয়সী পুরুষদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রায় ৫৯ শতাংশ উত্তরদাতা ২৬-৪০ বছর বয়সী পুরুষদের উত্ত্যক্তকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নারীদের যৌন হয়রানির মূল কারণ হচ্ছে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলোর অভাব। মৌখিকভাবে নারীর প্রতি নানা ধরনের কটাক্ষ বাক্যের বাইরেও শারীরিকভাবে যৌন হয়রানির মধ্যে রয়েছে ইচ্ছাকৃত স্পর্শ করা বা চিমটি কাটা, কাছ ঘেঁষে দাঁড়ানো বা আস্তে ধাক্কা দেওয়া, নারীদের চুল স্পর্শ করা বা কাঁধে হাত রাখা। ঘটনার শিকার হওয়া নারীরা কী করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ৮১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা চুপ করে থাকেন এবং ৭৯ শতাংশ বলেছেন তারা আক্রান্ত হওয়ার স্থান থেকে সরে যান। একটি দৈনিক পত্রিকায় এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

আর এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না, যারা নিত্য গণপরিবহনে চলাচল করেন, এ ধরনের অভিজ্ঞতা প্রায় সব নারীরই আছে। যখন কোনও পুরুষ ইচ্ছাকৃতভাবে নারীর গা ঘেঁষে দাঁড়ান তখন নারীটি সেই ব্যক্তির দিকে চোখ তুলে তাকালে ব্যক্তি নিজেই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে অতি ব্যস্ত হয়ে বলতে শুরু করেন, ‘সবারই মা বোন আছে...’ এবং এরপর কিছুটা সরে গিয়ে দাঁড়ান। আ র যারা সরেন না তারা জোরে চেঁচিয়ে তার কৃতকর্মের প্রতি অন্যদের সমর্থন লাভের আশায় বলতে থাকেন, ‘এমন অসুবিধা হলে বাসে ওঠেন কেন, নিজে গাড়ি কিংবা ট্যাক্সিতে চলাচল করতে পারেন।’ এর মধ্য দিয়ে এটাও বোঝানো হয়, গণপরিবহনে চলাফেরা করতে গেলে এই ধরনের ‘ঘষা’ খেতেই হবে। তবে ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়।

কেউ কেউ ফেসবুকে যুক্তি দিয়েছেন ‘ভিড়ে নারী-পুরুষ গা ঘেঁষেই দাঁড়াবে। ঠেলাঠেলি করে মাছবাজারে দরদাম করবে। তবেই না লিঙ্গ বৈষম্য উঠে যাবে’। হ্যাঁ এই যুক্তি অনেকেই সঠিক মনে করেন, বিশেষ করে ভাবা হয় যে আমরা যদি সব ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীকে দেখি তাহলে লিঙ্গ বৈষম্য কমে যাবে আর তা নারী নিপীড়ন কমাবে। এগুলো এক ধরনের ধারণাই মাত্র। অনেক কাজের ক্ষেত্রই আছে যেখানে হয়তো বেতন এবং কাজের ধরনে লিঙ্গ বৈষম্য নেই, কিন্তু যৌন হয়রানি আছে, নারী নিপীড়ন আছে।

তাই এই স্লোগানের সঙ্গে নারী-পুরুষের একসঙ্গে চলা, ধাক্কাধাক্কি করে গণপরিবহনে ওঠা কিংবা স্বাধীন মেলামেশাকে কিছুতেই গুলিয়ে ফেলা যাবে না। নারী, পুরুষ কোনও একক ক্যাটাগরি নয়। বিভিন্ন অথনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, জাতিগত অবস্থান সব মিলেই ব্যক্তির অবস্থান নির্ভর করে। তাই ব্যক্তি অভিজ্ঞতার ভিন্নতার ধরনের সঙ্গে ভিন্ন হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা।

আরও মনে রাখতে হবে, এ ধরনের প্রতিবাদ পুরুষের বিপক্ষে নয়, পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন এবং হয়রানির বিরুদ্ধে। আমরা হরহামেশাই পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্র এই দুটাকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলি এবং যার কারণে নিপীড়নের প্রতিবাদকে পুরুষবিরুদ্ধতা হিসেবে পাঠ করে নিজেকে নিজের পৌরুষদীপ্ততা এক করে ফেলি।

‘ঘা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ এই স্লোগান নারী-পুরুষসহ সব লিঙ্গের মানুষেরই হতে পারে, বিশেষ করে যারা যৌন হয়রানি করে তাদেরকে সাবধান করতে। ‘খারাপ স্পর্শ’ আর ‘অনিচ্ছাকৃত স্পর্শের’ পার্থক্য যদি আমরা ঠাহর করে আমলে নিই তাহলে এই স্লোগান আমাদের সবার জন্য প্রতিবাদের এক অনন্য ভাষা।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইমেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

সংক্রমণ কমছে, করোনা হটানোর এটাই সুযোগ!

সংক্রমণ কমছে, করোনা হটানোর এটাই সুযোগ!

৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক 

৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক 

১২৬ মাছে ভাগ্য খুলেছে রফিকুলের

১২৬ মাছে ভাগ্য খুলেছে রফিকুলের

বিশ্বে ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ৬ লাখ ৮৫ হাজার

বিশ্বে ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ৬ লাখ ৮৫ হাজার

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত দু'জনের  লাশ ভারতে উদ্ধার

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত দু'জনের লাশ ভারতে উদ্ধার

উপমহাদেশের স্বার্থে পাকিস্তানের স্বীকৃতি জরুরি

উপমহাদেশের স্বার্থে পাকিস্তানের স্বীকৃতি জরুরি

নতুন ঘর পেয়ে খুশি সুকজান বেগম

নতুন ঘর পেয়ে খুশি সুকজান বেগম

‘জীবনেও ভাবি নাই পাক্কা ঘরে ঘুমামু’

‘জীবনেও ভাবি নাই পাক্কা ঘরে ঘুমামু’

ঘর 'আপন' হওয়ার আগে আগলে রাখছেন তারা

ঘর 'আপন' হওয়ার আগে আগলে রাখছেন তারা

খুবির অস্থিতিশীল পরিবেশ প্রসঙ্গে সাবেক ২৭৩ শিক্ষার্থীর উদ্বেগ

খুবির অস্থিতিশীল পরিবেশ প্রসঙ্গে সাবেক ২৭৩ শিক্ষার্থীর উদ্বেগ

বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে ঘরে আগুন, প্রতিবন্ধী শিশুসহ নিহত ৪

বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে ঘরে আগুন, প্রতিবন্ধী শিশুসহ নিহত ৪

‘এত কাজ কেউ করতে পারেনি, জিতলে আরও করবো’

‘এত কাজ কেউ করতে পারেনি, জিতলে আরও করবো’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.