ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ দিতে হবে কৃষি খাতে 

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৩৭আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৩৭

কৃষি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে একটি ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এতদিন ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত আড়াই শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা ছিল। 

নতুন লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ এক অর্থবছরের ব্যবধানে কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ল ২১ হাজার কোটি টাকা। 

সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ নীতিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। একই অনুষ্ঠানে কৃষি ও পল্লি ঋণ কার্যক্রমের তদারকি জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ‘ওয়েবভিত্তিক কৃষি ঋণ ব্যবস্থাপনা তথ্য সফটওয়্যার’ উদ্বোধন করা হয়। 

নতুন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখাই নতুন নীতিমালার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে প্রান্তিক কৃষক, নারী কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

জামানত ছাড়াই ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ 

নতুন নীতিমালায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে প্রচলিত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির জামানতের পরিবর্তে বিকল্প জামানত ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত জামানত, সামাজিক জামানত ও দলগত জামানতের মতো ব্যবস্থা রয়েছে। 

বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের অর্থায়ন সহজ করতেই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে নীতিমালায় নির্ধারিত চার্জ দলিল ছাড়া অন্য কোনও অতিরিক্ত চার্জ দলিল গ্রহণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

এছাড়া ২ দশমিক ৫ একর পর্যন্ত জমিতে লবণ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ঋণ বিতরণে নীতিমালায় নির্ধারিত দলিলের বাইরে অতিরিক্ত দলিল গ্রহণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

কৃষক যাচাইয়ে কৃষক কার্ড 

প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি যুক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যয়ন ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি সরকার প্রবর্তিত কৃষক কার্ডের তথ্যও কৃষকের পরিচয় যাচাইয়ে ব্যবহার করা যাবে। 

এতে প্রকৃত কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছানো সহজ হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

পাসবই থাকা বাধ্যতামূলক নয় 

কৃষি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এতদিন যে পাসবই থাকা বা ইস্যুর বাধ্যবাধকতা ছিল, নতুন নীতিমালায় তা বাতিল করা হয়েছে। ফলে কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে। 

চুক্তিভিত্তিক কৃষির আওতায় ঋণ বিতরণও সহজ করা হয়েছে। এই ধরনের ঋণ বিতরণের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা শিথিল করা হয়েছে। 

দলবদ্ধ কৃষকদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ  

শস্য ও ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও একক কৃষকের পাশাপাশি দলবদ্ধ কৃষক বা খামারিদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষক দলের সদস্যসংখ্যার নির্ধারিত সীমাও শিথিল করা হয়েছে। 

পল্লি অঞ্চলে কৃষির পাশাপাশি বিভিন্ন আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডেও দলবদ্ধভাবে ঋণ বিতরণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের যৌথভাবে অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। 

নতুন খাত যুক্ত 

প্রতিবছরের মতো এবারও কৃষি ও পল্লি ঋণের আওতায় নতুন কয়েকটি খাত যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালন উল্লেখযোগ্য। 

এছাড়া শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা, মিশ্রি দানা, রোজেলা, শতমূল, গাছ আলু ও ব্লুবেরি ফল উৎপাদন এবং ডিমের খোসা ব্যবহার করে জৈব সার উৎপাদনের মতো নতুন কার্যক্রমও ঋণের আওতায় আনা হয়েছে। 

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিমা 

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি খাতে ঝুঁকি বাড়ছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন নীতিমালায় কৃষকদের বিমা সুবিধার আওতায় আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। 

ব্যাংক ও কৃষক বা গ্রাহকের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মতির ভিত্তিতে কৃষি ঋণের সঙ্গে বিমা সুবিধা যুক্ত করা যাবে। এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ুজনিত ক্ষতির ক্ষেত্রে কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

১০ হাজার ও ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন 

কৃষি খাতে অর্থায়ন আরও বাড়াতে ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সংক্রান্ত নীতিমালার সারসংক্ষেপ নতুন কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে। 

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি উন্নয়ন সাধারণ তহবিলের পরিচালনা-সংক্রান্ত নীতিমালাতেও সংশোধন এনেছে। 

ফসল উৎপাদনের সময় অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ  

নতুন নীতিমালায় বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন পঞ্জিকা এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচিও নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বছরজুড়ে কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা ও লিচু চাষের ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের সময় এবং ফসল কাটার সময় নির্ধারণের বিষয়টি এতে যুক্ত হয়েছে। 

ফসল কাটার পর থেকেই যাতে কৃষকের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ না পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফসল সংগ্রহের পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। 

কৃষি ঋণ তদারকিতে নতুন সফটওয়্যার 

কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণ এবং এর ব্যবহার আরও কার্যকরভাবে তদারক করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ওয়েবভিত্তিক কৃষি ঋণ ব্যবস্থাপনা তথ্য সফটওয়্যার’ চালু করেছে। এর মাধ্যমে কৃষি ঋণ কর্মসূচির সার্বিক তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ সহজ হবে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা, ঋণের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং নীতিনির্ধারণে প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহারে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, কৃষি খাতে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিপণ্যের সরবরাহও বাড়বে। এতে খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। 

একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য কমানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও কৃষি ঋণের ভূমিকা রয়েছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, ৬০ হাজার কোটি টাকার বড় লক্ষ্যমাত্রা এবং কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি বাড়বে। এর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনেও নতুন কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। 

/জিএম/এসটি/ 
সম্পর্কিত
আইডিআরএর সদস্য হলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ইডি সিরাজুল ইসলাম
এলসি খোলার অনুমতি পেলো এসএস পাওয়ার
কমছে ডলারের দাম
সর্বশেষ খবর
র‍্যাংকিংয়ের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার মান ও কর্মসংস্থান বাড়নোর পরামর্শ ইউজিসির 
র‍্যাংকিংয়ের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার মান ও কর্মসংস্থান বাড়নোর পরামর্শ ইউজিসির 
জার্মানির ভিসার অপেক্ষায় ওরা
জার্মানির ভিসার অপেক্ষায় ওরা
বাংলাদেশকে উচ্চশিক্ষার হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করছে ইউজিসি  
বাংলাদেশকে উচ্চশিক্ষার হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করছে ইউজিসি  
ওমানকে বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্পের, ইরানকে ‘সাদা পতাকা’ তোলার আহ্বান
ওমানকে বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্পের, ইরানকে ‘সাদা পতাকা’ তোলার আহ্বান
সর্বাধিক পঠিত
‘লিভ ইন সন্দেহে’ বিবাহিত দম্পতির ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় ৪ ছাত্রের হামলাচেষ্টা
‘লিভ ইন সন্দেহে’ বিবাহিত দম্পতির ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় ৪ ছাত্রের হামলাচেষ্টা
এক সিনেমার সম্মানী দিয়ে পাকিস্তানে বাড়ি কেনেন শবনম
এক সিনেমার সম্মানী দিয়ে পাকিস্তানে বাড়ি কেনেন শবনম
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই এমরানকে ট্রান্সফার করবেন’, ফোন দিয়ে বললেন মন্ত্রী
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই এমরানকে ট্রান্সফার করবেন’, ফোন দিয়ে বললেন মন্ত্রী
মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ
মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’