নতুন বছরকে বরণ

আনন্দ শোভাযাত্রায় হাজারো প্রাণের উচ্ছ্বাস

বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিয়েছে বাংলাদেশ। পহেলা বৈশাখে সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎসব উদযাপনের মাধ্যমে নববর্ষকে বরণ করে নেয় বাঙালিরা। নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের আয়োজনে হয় ববর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান ফ্যাদিবাদের অবসান’।

সোমবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টায় চারকলা থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয় হাজারো মানুষ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব জাতিসত্তার মানুষ শোভাযায় অংশ নেয়। সকাল ৯টায় শুরু হয়ে ১০টা ৩০ মিনিটে শেষ হয় শোভাযাত্রাটি।

চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে শাহবাগ মোড়, টিএসসি মোড়, শহীদ মিনার, শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র ও দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তা দিয়ে পুনরায় চারুকলা অনুষদে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় শুরুতেই ছিল পুলিশের সুসজ্জিত ১৮টি ঘোড়া। এরপরেই ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।

আনন্দ শোভাযাত্রা (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

এবারের শোভাযাত্রায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা এসেছিলেন নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করে। নিজস্ব বাদ্য বাজিয়ে নেচে-গেয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেন তারা। এ সময় তাদের হাতে থাকা প্লাকার্ডে পাহাড়ে সেনা শাসন হটানোসহ শেখ হাসিনার বিচার দাবিও লক্ষ করা যায়।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধিদের পরেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের র‌্যালি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুন আহমেদ, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান, প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদসহ একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা।

শিক্ষকদের র‍্যালির পরেই একে একে মোটিফগুলো নিয়ে আসা হয়। স্বৈরাচারের মুখাকৃতি, কাঠের বাঘ, ইলিশ, শান্তির পায়রা, পালকি, পানির বোতল, ৩৬ জুলাই মোটিফগুলো র‍্যালিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল ফ্যাসিবাদের প্রতিকৃতি (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

এছাড়াও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি দল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। পরে ৫০ সদস্য বিশিষ্ট বাউল সাধুর দল; ১০০ সদস্য বিশিষ্ট কৃষকদল ও মূলধারার শিল্পী-গোষ্ঠী; সাধনা নৃত্য সংগঠনের ১০০ সদস্যের দল; রংধনু পোশাকশ্রমিক শিল্পী সংগঠনের ৫০ জনের দল; ২০ সদস্য বিশিষ্ট নারী ফুটবলারের একটি প্রতিনিধি দল; অ্যাক্রোবেটিক শিল্পীদের ১৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি দল শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।

শোভাযাত্রা ঘিরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম রোভার বিএনসিসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। র‍্যাব, সোয়াট ও পুলিশের সতর্ক অবস্থান লক্ষ করা যায়। প্রতিটি পয়েন্টে পয়েন্টে পুলিশের সতর্ক অবস্থান শোভাযাত্রার নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত করে।

শোভাযাত্রায়, শান্তির পায়রা মোটিফটির মাধ্যমে এ দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তির বার্তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মুগ্ধের পানির বোতল ও ৩৬ জুলাই মোটিফের মাধ্যমে ২৪ এর চেতনাকে ধারণ করা হয়েছে। তরমুজের ফালি মোটিফের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানানো হয়।

কেমন হয়েছে আনন্দ শোভাযাত্রা?

আনন্দ শোভাযাত্রায় বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়। অনেকেই প্রথমবার এসেছেন শোভাযাত্রায়। অনেকেই আবার প্রতি বছরই এই দিনটি উদযাপন করতে এখানে আসেন।

শোভাযাত্রায় প্রাণের উচ্ছ্বাস (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

দর্শনার্থী ও শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, এবারের শোভাযাত্রা আগের থেকে অনেক বড় এবং উৎসবমুখর হয়েছে।

তঞ্চঘ্যা জাতিগোষ্ঠীর র‍্যাভেন বলেন, এবারই প্রথম আমি শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছি। দারুণ লাগছে। আমাদের জাতিগোষ্ঠীর অনেক দাদা এখানে এসেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাওয়াদ বলেন, আমি কয়েকবার অংশগ্রহণ করেছি। এবার ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশের প্রথম নববর্ষ অনেক বেশি ইনক্লুসিভ, বড় এবং সুন্দর হয়েছে। বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট এর মুখাকৃতি পুড়িয়ে দেওয়ার পর নব উদ্যমে তারা যে একদিনের মধ্যে আরেকটি বানিয়েছে এটি প্রশংসনীয়।

স্ত্রীসহ অংশগ্রহণ করেন হাবিবুর রহমান। তিনি পুরান ঢাকায় ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, আমি প্রতি বছরই এখানে আসি। এ বছর একটু বেশি স্পেশাল। এ বছর শোভাযাত্রা বড় এবং সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে।