জনগণই একদিন বলবে ‘পুলিশ আমাদের বন্ধু’

ডিএমপির প্রতিষ্ঠা দিবসে বক্তব্য রাখছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বাহিনীকে জনবান্ধব করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। পুলিশের ঊর্ধ্বতনসহ সংশ্লিষ্টরা বরাবরই বলছেন, ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’। বর্তমান পুলিশ ও অতীতের পুলিশ এক নয়। বর্তমান পুলিশ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস মোকাবিলা করছে। কিন্তু পুলিশ কতটুকু জনবান্ধব হতে পেরেছে, তা নির্ভর করবে জনগণ পুলিশ সম্পর্কে কী ভাবছে ও তাদেরকে কতটা সহজভাবে গ্রহণ করছে, তার ওপরে। যেদিন জনগণ নিজে থেকে বলবে, ‘পুলিশ আমাদের বন্ধু’ সেদিনই বলা যাবে— বাংলাদেশ পুলিশ, জনবান্ধব পুলিশ।

শনিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে ডিএমপির ৪৩তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নাগরিক প্রতিনিধিরা এসব কথা বলেন। দুপুরে ডিএমপি হেডকোয়ার্টারস থেকে এক বর্ণাঢ্য র‌্যালি নিয়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আসেন ডিএমপিতে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা। শুরু হয় নাগরিক সংবর্ধনা। কেক কেটে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এরপর ডিএমপি প্রতিষ্ঠা দিবসে শুভেচ্ছা ও নিজেদের মতামত তুলে ধরেন আগতরা।

সব কাজের দায়্ত্বি পুলিশের ওপর না চাপিয়ে কিছু কাজ জনগণকেও ভাগাভাগি করে নিতে হবে বলে মনে করেন, অভিনেতা ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, ‘আমরা সব কাজের দায়িত্ব পুলিশের ওপর দিয়ে দায় সারি। নিজেরা কোনও দায়িত্ব নেই না। সব কাজ পুলিশকে করতে হলে এই বাহিনীকে হতে হবে ফেরেশতা বা জ্বিন। পুলিশ তার নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এখন সময় এসেছে, আমাদের বলতে হবে—আমাদের বন্ধু পুলিশ।’

পুলিশের কাজের জবাবদিহিতার প্রশংসা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘ডিএমপি গত একবছরের কর্মকাণ্ডের চিত্র ডকুমেন্টারি আকারে আজ  প্রকাশ করেছে। এটা পুলিশের জবাবদিহিতার বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়।’

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশ্বের অন্য যেকোনও দেশের তুলনায় ভালো উল্লেখ করে লেখক, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আগের তুলনায় বাংলাদেশ পুলিশ তাদের কার্যক্রমে অনেক বেশি জনবান্ধব।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আর সেই কাজের প্রশংসা করেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি)  ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। তার ভাষ্য— ‘আমরা বলে থাকি ঢাকা মহানগর পুলিশ হলো বাংলাদেশ পুলিশের দর্পণ। সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। সেজন্য ডিএমপি সর্বোচ্চ দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এটা অতীতে যেমন দেখা গেছে, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তারা এ দায়িত্ব পালন করবে বলে আশা করছি।’ 

তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে ডকুমেন্টারিতে আমরা দেখেছি, জঙ্গিবাদ দমনে ডিএমপির সফলতা চিত্র। বর্তমানে জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ পুলিশ যতটুকু সফল হয়েছে, তার সিংহভাগ ঢাকা মহানগর পুলিশ ও বিশেষজ্ঞ ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজমের দখলে।’

পুলিশ এখন অনেকটা জনবান্ধব বলে মন্তব্য করেন আইজিপি। তিনি বলেন, ‘‘ছোটকাল থেকে পুলিশ সম্পর্কে মানুষের মনে যে ভীতি ঢুকিয়ে দেওয়া হতো, সেটা এখন আর নেই। বর্তমানে কেউ আর শিশুদের বলে না— ‘এই চুপ করো পুলিশ আসছে।’ পুলিশ এখন অনেকটা জনবান্ধব, নারীবান্ধব, শিশুবান্ধব। আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে, অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আমরা চাই, জনতার সঙ্গে, জনতার কাছে, জনতার হয়ে, সেই জনতার পুলিশ হওয়ার জন্য। যাতে মনে হয় আমরা শুধু ইউনিফর্ম পরা জনতা, যা আসলে জনতারই অংশ। যেটা কমিউনিটি পুলিশিংয়ের একমাত্র মূলমন্ত্র। বাংলাদেশ পুলিশ কখনও পিছু পা হয়নি, সেটা মুক্তিযুদ্ধ হোক, আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হোক, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধেই হোক, সবসময় বাংলাদেশ পুলিশ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব যুদ্ধে জয়ী হয়েছে।’ 

জনগণের উদ্দেশে আইজিপি  বলেন,  ‘আপনাদের সহযোগিতা পেলে, আপনাদের পাশে পেলে পুলিশ সব অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারবে এবং নিশ্চয়ই সেসব যুদ্ধে আমরা জয়ী হবো।’

জনগণ একদিন বলবে ‘পুলিশ আমাদের বন্ধু’ এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের প্রধান বলেন, ‘‘ডিএমপির সবার সাফল্য কামনা করে আগামী দিনগুলোতে যেন মানুষের আরও কাছাকাছি যেতে পারি, মানুষের জন্য কাজ করতে পারি, যাতে বার বার আমাদের না বলতে হয়— ‘পুলিশ মানুষের বন্ধু’ অথবা ‘জনগণের বন্ধু’। জনগণই যাতে বলে ‘পুলিশ আমাদের বন্ধু’। আসুন, আমরা সেদিনের প্রত্যাশায় এগিয়ে যাই।’’

নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি উপস্থিত নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশকে জনগণ ভালোবাসে বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে শুরু করে, আমাদের শিল্পীরা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, বিদেশি কূটনীতিকসহ সবাই এখানে এসেছেন। আপনারা এসেছেন কারণ, পুলিশ আপনাদের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটা অর্জন করেছে। বর্তমান পুলিশ ও আগের পুলিশ এক নয়। এরা জনগণের বন্ধু, এরা জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে। জীবন বাজি রেখে তারা জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে আরও শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য করার প্রচেষ্টা চলছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বড় বড় সব অনুষ্ঠান ঢাকাকেন্দ্রিক। সেজন্য আরও  অনেক কাজ ডিএমপিকে করতে হবে। আমরা ডিএমপিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য, আরও নির্ভরযোগ্য করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আমরা সেই পুলিশ তৈরি করছি, যারা সব সময় জনগণের পাশে থাকবে।’

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার (ডিএমপি) মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বিগত বছরে ডিএমপির অর্জনগুলো তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তিনি জানান, নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উন্নত নাগরিক সেবা দিতে ডিএমপি সব সময় বদ্ধপরিকর।’