ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে দুটি পরিকল্পনা নিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির ডেঙ্গু প্রতিরোধ দফতর ‘কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট’ ও উত্তর সিটির ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট’ দুটি আলাদা প্রকল্প নিয়েছিল। প্রকল্প দুটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমাও দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দিয়ে তা সারাদেশে চালুর পরামর্শ দেয় মন্ত্রণালয়। ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে গেলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
মন্ত্রণালয়ের দাবি তারা প্রকল্পটির জন্য নীতিমালা তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেবে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, করোনার মতো ডেঙ্গুও মহামারি আকার নিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ব্যাপক আকার নেবে। ২০১৯ সালের মতো পরিস্থিতির হলে এখনকার জনবল ও যন্ত্রপাতি দিয়ে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে মনে করছে সিটি করপোরেশন।
২০১৯ সালেই ডেঙ্গুর অবস্থা দেখে নড়েচড়ে বসে দুই সিটি করপোরেশন। তখন সরকারের পক্ষ থেকেও প্রেশনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে কর্মকর্তাদের সিটি করপোরেশনের পাঠানো হয়। চিরুনি অভিযান থেকে শুরু করে ভ্রাম্যামাণ আদালতসহ বিভিন্ন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করা হয়। তারপরও এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ৩১৯ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ছাড়া পেয়েছেন ৩ হাজার ৩১২ জন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কলকাতা ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ থেকে নেওয়া হয় পরিকল্পনা। উত্তর সিটির মেয়র কলকাতা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আর দক্ষিণের তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন করেন সিঙ্গাপুর ভ্রমণ। সেখানকার অভিজ্ঞতার আলোকে তারা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে আলাদা দফতর স্থাপনের প্রস্তাব দেন। ওটার ভিত্তিতেই প্রকল্প তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
দক্ষিণের পাঠানো প্রকল্প শুরু থেকেই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। উত্তর সিটির মেয়র দেশের কীটতত্ত্ববিদদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ প্রকল্প গ্রহণের সুপারিশ করে। এরপর প্রকল্পের প্রস্তাবনা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায় ডিএনসিসি। সেটা নিয়ে এখনও কাজ শুরু হয়নি।
জানতে চাইলে মেয়র আতিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট’ করতে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প জমা দিয়েছি। সেখান থেকে কিছু কারেকশন এসেছে। আমরা চাই বিষয়টি দ্রুত অনুমোদন হোক। তা হলে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।’
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবউনকে বলেন, তিনি শুধু ঢাকা নিয়ে নয়, পুরো দেশ নিয়ে চিন্তা করছেন। প্রকল্পটির বিষয়ে একটি নীতিমালাও তৈরি করেছেন। কিছু কারেকশন দিয়ে এরইমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে।
তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের নিজস্ব সেল রয়েছে। আমাদেরও মশকনিধন সেল আছে। সেখান থেকে তদারকি করা হচ্ছে। নতুন করে আদালা দফতরের প্রয়োজন আছে বলে মনে হচ্ছে না।’
প্রকল্প অনুমোদনে দেরি হচ্ছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দেরি হচ্ছে না। সব ঠিকঠাকই চলছে। বাংলাদেশ এখন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এক নম্বরে আছে। দুই মেয়রই ভালোভাবে কাজ করছেন।’
তিনি জানান, ‘গতবছর বাংলাদেশে ডেঙ্গু হয়েছিল এক হাজার ১৭৪ জনের। সিঙ্গাপুরে হয়েছিল ৯ হাজার ৪৪২ জনের। থাইল্যান্ডে ৭০ হাজার, ফিলিপাইনে ২ লাখ ২৫ হাজার। মালয়েশিয়াতে জুলাইতে হয়েছে ১৪ হাজার জনের। সিঙ্গাপুরে এই মুহূর্তে ৫০০ জনের মতো রোগী রয়েছে। আর আমাদের এখানে আক্রান্ত তিন হাজারের মতো। ফ্রান্সেও এই মুহূর্তে ২৮ হাজারের মতো রোগী আছে। বাংলাদেশে যারা আমাদের দোষারোপ করছে তারা তথ্য না জেনে করছে।’
মন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী ১০ কোটি থেকে ৪০ কোটি লোক বিভিন্ন সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। এ ধরনের রোগে বছরে গড়ে সাত লাখ লোক মারা যায়। গতবছর আমরা নিয়ন্ত্রণেই রেখেছিলাম। আমরা যে এত কাজ করছি তার স্বীকৃতি নেই।’