সেকশনস

৭ মার্চের ভাষণ চিরকালের ‘জীবন্ত বঙ্গবন্ধু’

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২০, ০৮:০৮

 

স্বদেশ রায় একটা নরগোষ্ঠীকে একটি বিশেষ জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে তাঁকে জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পর ওই জাতি স্বাভাবিকভাবে অনেক ইতিহাস সৃষ্টি করে। সাধারণত একটা নরগোষ্ঠীকে জাতিতে রূপান্তরিত করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। কারণ জাতীয়তাবাদের এক একটি উপাদান সমাজে ও মানুষের মননে স্থান নিতে বা তৈরি হতে দীর্ঘ সময় নেয়। বাস্তবে বিবর্তনবাদের পথই অনুসরণ করে। তবে এখানে প্রকৃতির পাশাপাশি শ্রম ও কাজের ধরন বেশ বড় ভূমিকা রাখে। একটি জাতির নিজস্ব গান সৃষ্টির জন্য প্রকৃতির ধরন যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি শ্রম ও কাজের প্রকৃতিও ভূমিকা রাখে। এমনিভাবে বাস্তব দৈনন্দিন ও নান্দনিক জীবনের ভেতর দিয়ে জাতীয়তাবাদের যে যাবতীয় উপাদান তৈরি হয় তা হাজার বছরের প্রক্রিয়া।
বাঙালিও তার জাতীয়তাবাদের সব উপাদান তৈরি করেছে প্রায় তিন হাজারের বেশি বছর সময় ধরে। কারণ, খ্রিস্টের জন্মেরও পাঁচ-ছয়শ’ বছর আগে বাঙালির যে ইতিহাস পাওয়া যায় সেখানে বাঙালিত্বের অনেক উপাদান মেলে। তাই বিংশ শতকে যখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় সে সময় বাঙালি তার নিজস্ব জাতীয়তাবাদের উপাদানে পরিপূর্ণ একটি জাতি ছিল। কিন্তু তখন বাঙালি ছিল সর্বভারতীয় আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী একটি নরগোষ্ঠী। এই নৃগোষ্ঠীতে তখন চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষ বোসের মতো নেতা জন্মালেও তাঁরা সর্বভারতীয় নেতা হয়েছিলেন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সৃষ্টিতেই তাঁরা তাদের নেতৃত্বের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই দুজনের কেউই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক ধরনের অপমৃত্যু এবং নরহত্যার ভেতর দিয়ে ধর্মের নামে দ্বিখণ্ডিত হওয়া ভারতবর্ষ দেখে যাননি। বঙ্গবন্ধু যখন শেখ মুজিবুর রহমান অর্থাৎ একজন তরুণ নেতা, তখনই তাঁর শরীরে লাগে ওই নরহত্যার রক্ত। যা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। এত বড় ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম যেখানে নরহত্যার ভেতর দিয়ে সমাপ্তি হলো, সেখানে শান্তি, মুক্তি, স্বাধীনতা সর্বোপরি মানব-আত্মার বিকাশ কোন পথে? খণ্ডিত ভারতে বঙ্গবন্ধুর যাত্রা শুরু দেখে বোঝা যায় তিনি মানব-আত্মার একটি সঠিক মুক্তির পথ খুঁজছেন। পৃথিবীজুড়ে তাঁর আন্দোলন হলে তিনি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে সীমাবদ্ধ থাকতেন কিনা সেটা বলা যায় না। কারণ, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি বিশ্বফোরামে সব সময় সারা বিশ্বের মানুষের মুক্তির কথাই বলেছেন। অন্যদিকে খণ্ডিত ভারতে পূর্ববাংলায় ফিরে তিনি স্পষ্টই বুঝতে পারেন পূর্ববাংলার মানুষ ব্রিটিশের থেকেও কঠিন শেকলে বন্দি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তখন আর দ্বিধা না রেখে পূর্ববাংলার মানুষকে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদে জাগিয়ে তোলার পথে নামেন। বঙ্গবন্ধুর কাজ, তাঁর রাজনীতি, তাঁর লেখা সবই গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তিনি তাঁর সমাজকে অনেক বেশি বুঝতেন। সমাজ সম্পর্কে তাঁর এই প্রজ্ঞাই পূর্ব বাংলাভিত্তিক বাঙালি নরগোষ্ঠীকে নিয়ে দ্রুত একটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন গড়ে তুলতে বেশি সময় নেয় না।
এটা সত্য যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করতে বঙ্গবন্ধু সময় নিয়েছিলেন মাত্র ২২ বছর। তাই স্বভাবতই মনে হয় বঙ্গবন্ধু একটু বেশি দ্রুত ছুটেছিলেন। বাস্তবতা হলো, রকেট যেমন নিয়ম মেনে দ্রুতগতিতে ছোটে, বঙ্গবন্ধু তেমনি ছুটেছিলেন। একটি জাতিগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় কোনও ধাপই তিনি বাদ দেননি। খুব যদি মোটা দাগে বলি তাহলে ৪৮ থেকে ৫২ ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও প্রস্ফুটনকাল। ৫৪ নির্বাচন থেকে ৬৬-এর ৬ দফা পর্যন্ত স্বাধিকার ও জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব অর্থনীতির কাঠামোগত ধারণা প্রস্ফুটনের কাল। আর ৬৮, ৬৯ এবং ৭০-এর নির্বাচন ছিল ওই জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভূখণ্ড তৈরির ভিত্তিভূমি প্রতিষ্ঠারকাল।
ওপরের অধ্যায়গুলো প্রমাণ করে একটি জাতিগোষ্ঠীকে জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসে ১৯৭১-এর মার্চ মাসে পৌঁছান বঙ্গবন্ধু। তাই ৭ই মার্চের ভাষণ তিনি যখন দেন, ততদিনে তাঁর জাতিগোষ্ঠী জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের শিখরে পৌঁছেছে। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার, সাধারণত কোনও জাতিগোষ্ঠীকে জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকজন নেতাই ভূমিকা রাখেন। আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে আসতে বঙ্গবন্ধুর অনেক সুযোগ্য সহকর্মী ছিলেন, অনেক স্নেহধন্য তরুণ কর্মী ছিলেন, কিন্তু মূল নেতৃত্বে ছিলেন তিনি একাই। তাই ৭ই মার্চ যখন তিনি মঞ্চে আসেন তখন তিনি শুধু নির্বাচিতভাবে একক নেতা নন, আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসা একক নেতাও। এ কারণে ওই সময়ে তাঁর কাজ ছিল দুটো। জাতিকে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া এবং আরেকবার সর্বশেষ জাতীয়তাবাদের আগুনে সেঁকে উত্তপ্ত করা। আর এ কারণেই আন্তর্জাতিক বিচারের পরিমণ্ডলে নয়, জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের বিচারে ৭ই মার্চের ভাষণই একমাত্র ভাষণ, যা একটি জাতিকে সর্বোচ্চ জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ এবং তাঁর জাতির মুক্তির জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত করে।
৭ই মার্চের ভাষণের পর তাই বাঙালির আর বাঙালি বলতে কোনও দ্বিধা থাকে না। বরং সে নিজেকে আপন মহিমায় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে নিরস্ত্র থেকে সশস্ত্র হয়ে ওঠে। বলা যেতে পারে এ যেন সেদিনের শব্দ থেকে অস্ত্র তৈরির এক আশ্চর্য জাদুকরী বিষয়। তাই ৭ই মার্চের নির্দেশনা অনুযায়ী যেমন হাতে, মাঠে, পানিতে সর্বাত্মক যুদ্ধ হয়েছিল তেমনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ‘বজ্রকণ্ঠ’ নামে ৭ই মার্চের ভাষণের শব্দগুলোও যুদ্ধ করেছিল।
এক নরহত্যার ভেতর দিয়ে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ধর্মের আলখেল্লায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তাকে কেউ ঠেকাতে পারেনি। কিন্তু আর এক নরহত্যা পার হয়ে আসা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধর্মের আলখেল্লায় ঢাকা যায়নি। বরং আরও বেশি রক্ত গায়ে মেখে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভারতবর্ষের পূর্ব খণ্ডে বাংলাদেশ নামে নতুন দেশ সৃষ্টি করে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের নতুন সূর্যের উদয় ঘটায়। আর এটা সম্ভব হয়েছিল পাকিস্তানিদের নরহত্যার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু তাঁর বাঙালি জাতিকে ৭ই মার্চের ভাষণের আগুনে সেঁকে সশস্ত্র করে রেখে গিয়েছিলেন বলে। তাই ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের চিরকালের ‘জীবন্ত বঙ্গবন্ধু’।

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

চিকিৎসা সেবার জন্য আয় থেকে সঞ্চয় জরুরি

চিকিৎসা সেবার জন্য আয় থেকে সঞ্চয় জরুরি

‘নাপিতকে বিয়ে করেছেন নারী চিকিৎসক’: সত্যিই লজ্জিত আমি

‘নাপিতকে বিয়ে করেছেন নারী চিকিৎসক’: সত্যিই লজ্জিত আমি

স্বাস্থ্যের ভূত যেন ভ্যাকসিনে চেপে না বসে

স্বাস্থ্যের ভূত যেন ভ্যাকসিনে চেপে না বসে

সেফহোমে থাকা বঙ্গনারীর আকুতি

সেফহোমে থাকা বঙ্গনারীর আকুতি

জলে ভাসা ঈদ

জলে ভাসা ঈদ

করোনার জন্য প্রস্তুতি

করোনার জন্য প্রস্তুতি

ওই মহামানব আসে

ওই মহামানব আসে

‘আবার আসিবো ফিরে এই বাংলায়’

‘আবার আসিবো ফিরে এই বাংলায়’

মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য

মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য

নিরাপদ পারমাণবিক শক্তি কোনও কল্পকাহিনি নয়

নিরাপদ পারমাণবিক শক্তি কোনও কল্পকাহিনি নয়

নতুন শিক্ষাক্রম নতুন আশা

নতুন শিক্ষাক্রম নতুন আশা

ধর্ষণবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার

ধর্ষণবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার

সর্বশেষ

দেশে ঋণ খেলাপি তিন লাখ ৩৫ হাজার জন

দেশে ঋণ খেলাপি তিন লাখ ৩৫ হাজার জন

মেয়ার্সের ‘প্রথম’ শিকার শান্ত

মেয়ার্সের ‘প্রথম’ শিকার শান্ত

সংসদে বিল পাস, দেশে-বিদেশে শাখা খুলতে পারবে ট্রাভেল এজেন্সি

সংসদে বিল পাস, দেশে-বিদেশে শাখা খুলতে পারবে ট্রাভেল এজেন্সি

সব জেলায় হাইটেক পার্ক হবে: পলক

সব জেলায় হাইটেক পার্ক হবে: পলক

আ. লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর নির্বাচনি কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ

আ. লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর নির্বাচনি কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ

প্রথম ওভারেই ফিরেছেন লিটন

প্রথম ওভারেই ফিরেছেন লিটন

নিজ দল থেকে বহিষ্কৃত নেপালের প্রধানমন্ত্রী

নিজ দল থেকে বহিষ্কৃত নেপালের প্রধানমন্ত্রী

করোনা ভ্যাকসিনের প্রথম চালান পৌঁছেছে ঢাকায়

করোনা ভ্যাকসিনের প্রথম চালান পৌঁছেছে ঢাকায়

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের করোনা শনাক্ত

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের করোনা শনাক্ত

দুই পরিবর্তন নিয়ে টস হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ

দুই পরিবর্তন নিয়ে টস হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ

পূর্বাচলে প্লট কিনে দেওয়ার কথা বলে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

পূর্বাচলে প্লট কিনে দেওয়ার কথা বলে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

টিভিতে আজ

টিভিতে আজ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.