ডায়রিয়া হলে শিশুকে ওরস্যালাইন খাওয়ানোর পাশাপাশি সব ধরনের খাবার দিতে হবে, এটাই স্বাভাবিক চিকিৎসা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুরা অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে। এই অবস্থা প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপ করছেন চিকিৎসকরা।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে কথা হয় সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তার দেড় বছরের ছেলে সাইফ ইবনে আলিফ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য ভর্তি করেছেন এখানে। সুমাইয়া জানান, ছেলের ডায়রিয়া হওয়ায় স্থানীয় ফার্মেসিতে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসক (ফার্মেসির সেলসম্যান) ওরস্যালাইনের পাশাপাশি চারটা অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট দেয় এবং কোনও খাবার খাওয়াতে না করেছে।
সুমাইয়া বলেন, ‘ছেলের ডায়রিয়া কমে না দেখে প্রথমে ওরে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেছিলাম। সেখানে সিট খালি নাই দেখে ছেলেকে এখানে নিয়ে এসেছি। এখানকার চিকিৎসক বলেছেন, ওকে ওরস্যালাইন খাওয়াইলেই হতো। সব ধরনের খাবার ও যা যা খায়, সবই দিতে হতো। আমি তো বুঝি নাই চিকিৎসক (ফার্মেসির দোকানদার) যা বলেছে তাই করেছি।’
প্রায় একই ধরনের ঘটনার শিকার রাজধানীর লালবাগের শিশু নিশাত আক্তার (১৪ মাস)। সেও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তার মা সুফিয়া বেগম সন্তানকে নিয়ে প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসিতে গিয়েছিলেন। তাকেও ওরস্যালাইনের পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় এবং কোনও খাবার দিতে নিষেধ করা হয়— বললেন নিশাতের মা সুফিয়া বেগম।
শুধু সুমাইয়া আক্তার বা সুফিয়া বেগম নয়, বেশির ভাগ মা-বাবাই শিশুদের ডায়রিয়া হলে হাসপাতালে না নিয়ে ছুটে যান স্থানীয় ফার্মেসিতে। অনেক মায়েরা আবার শিশুর জন্য এক প্যাকেট ওরস্যালাইন নির্ধারিত আধা লিটার পানিতে না গুলিয়ে অল্প পানিতে মিশিয়ে শিশুকে খাওয়ান। অজ্ঞতা থেকেই তারা এটি করেন। আর এই ভুলের শিকার হচ্ছে শিশুরা। ফলে শিশুরা সুস্থ হওয়ার বদলে ভুল চিকিৎসায় আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বরত কর্মকর্তা ডা. মো. শাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯ ডিসেম্বর সারাদেশে ৯২৮ জন মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। গত এক সপ্তাহে এই সংখ্যা ছিল সাত হাজার ১৭১ জন। গত একমাসে সারা দেশে আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ হাজার ৭৩২ জন। আর গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত (২৩ ডিসেম্বর) চার লাখ ২৫ হাজার ৪৬৮ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে একজন মারা গেছেন।’
রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকার একটি ফার্মেসির বিক্রেতা আনিসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি গত ৩৭ বছর ধরে ফার্মেসি চালাই। বিভিন্ন সময় রোগীরা চাইলে ওষুধ দেওয়াই লাগে। ডায়রিয়া হলে ফিলমেট ট্যাবলেট খেতে দিই।’
এ অবস্থা পরিবর্তনে ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. এহসানুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার কর্ম এলাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন এরিয়ার বাইরে। ওইসব এলাকায় আমাদের নিজস্ব কর্মী আছে, যারা প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে সচেতনতার কাজগুলো করে। কিন্তু ঢাকা সিটি করপোরেশনের মধ্যে আমাদের নিজস্ব কোনও কর্মকর্তা নেই, সিটি করপোরেশনেরও নিজস্ব কোনও কর্মকর্তা বা কর্মী নেই। তাদের নিজস্ব কোনও নেটওয়ার্ক নেই। তারা কিছু এনজিওর মাধ্যমে কার্যক্রম চালায়, যেটা খুব সমন্বিত না এবং খুব একটা কার্যকরও না। ঢাকা সিটির তথ্যগুলো আমরা তখনই পাই— যখন কোনও হাসপাতালে বেশি রোগী ভর্তি হয়।’
ফার্মেসিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওষুধ বিক্রি হবে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী। কিছু কিছু ওষুধ ফার্মেসি বিক্রি করতে পারে। যেমন—প্যারাসিটামল, অ্যান্টাসিড ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। এগুলো শরীরের জন্য ক্ষতি হবে না। এ ধরনের প্রোডাক্ট সারা পৃথিবীতে আছে, যেগুলো ফার্মেসি থেকে কেনা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি হচ্ছে, যদিও এটা আইনসম্মত না।’
জাতীয় পুষ্টি সার্ভিসের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. এম ইসলাম বুলবুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমারা সাধারণত ডায়রিয়া হলে শিশুকে স্বাভাবিক খাবার, ওরস্যালাইন এবং শিশুদের জিঙ্ক সিরাপ খাওয়াতে বলি। এগুলো খাওয়ানোর পর অবজারভেশন করতে বলি। তিনদিন পর্যন্ত মোটামুটি এভাবে শিশুকে অবজারভেশনে রাখা হয়। তিনদিনে সাধারণত ডায়রিয়া কমে যায়। যদি না কমে তখন যেকোনও চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া ভালো। অথবা শিশুকে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত। আমাদের সবগুলো সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশুদেরকে ডায়রিয়ার চিকিৎসা দেওয়া হয়। আর ডায়রিয়া নিয়ে অভিভাবকদের সচেতনতার কাজটি স্পেশালি যদি বেশি পরিমাণ কেস থাকে, কলেরা বা ডায়রিয়া— তখন এই কাজটি আইসিডিডিআর-বি করে থাকে।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফার্মেসিগুলো রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক নিজেরাই দেয়। কিন্তু তাদেরতো অ্যান্টিবায়োটিক দেবার কথা না। দেখি, বিষয়টি নিয়ে আমরা আলাপ করবো— কীভাবে বিষয়টির সমাধান করা যায়।’